বেলুসভের ভোট, রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ডুমা নির্বাচনে নেতৃত্বের বার্তা

রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলুসভ ১৯ সেপ্টেম্বর স্টেট ডুমা নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, চলমান যুদ্ধের মধ্যেই চলছে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় নির্বাচন।

বেলুসভের ভোট, রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ডুমা নির্বাচনে নেতৃত্বের বার্তা

বেলুসভের ভোট, রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ডুমা নির্বাচনে নেতৃত্বের বার্তা


মস্কো, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬: রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলুসভ ১৯ সেপ্টেম্বর দেশটির স্টেট ডুমা নির্বাচনে ব্যক্তিগতভাবে ভোট দিয়েছেন। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি একটি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে কাগজের ব্যালটে ভোট দেন। বিষয়টি রুশ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নির্বাচনের দ্বিতীয় দিনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে উঠে এসেছে। 


বেলুসভের ভোট দেওয়ার ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন রাশিয়ায় নবম স্টেট ডুমা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলছে। দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ৪৫০টি আসনের জন্য এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচনটি রাশিয়ার ২০২২ সালের ইউক্রেন আক্রমণের পর প্রথম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচন হওয়ায় এর রাজনৈতিক গুরুত্বও বেশি। 


রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ফুটেজের ভিত্তিতে ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, বেলুসভ নিজে একটি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছেন। তবে মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে তার ভোট দেওয়াকে ‘নাগরিক দায়িত্ব’, ‘জাতীয় ঐক্য’ বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে যুক্ত করে বিস্তারিত বক্তব্যের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। 


এ কারণে “Leadership sets the example” বা বেলুসভের ভোটদান সরাসরি জাতীয় ঐক্যের আহ্বান—এ ধরনের ভাষা মূলত রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা সংবাদমূলক ফ্রেমিং; এটিকে বেলুসভের সরাসরি বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। একইভাবে, তিনি ভোট দেওয়ার সময় কোনো বিশেষ মন্তব্য করেছেন—এমন নির্ভরযোগ্য তথ্যও পাওয়া যায়নি।


রাশিয়ার এবারের নির্বাচন তিন দিন ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ১৮ সেপ্টেম্বর অনলাইনে ভোট দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ভোট দিয়েছেন বলে রুশ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। বিপরীতে বেলুসভ সরাসরি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে কাগজের ব্যালট ব্যবহার করেছেন। 


নির্বাচনকে ঘিরে রাশিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যাপকভাবে ভোটদানের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। পুতিন নির্বাচনে অংশগ্রহণকে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ভোটকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও যুদ্ধকালীন নীতির প্রতি সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে তুলে ধরেছেন। 


তবে এই নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে পশ্চিমা সরকার, বিরোধী দল ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ যুদ্ধবিরোধী প্রার্থী ও রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ সীমিত করা হয়েছে। উদারপন্থী ইয়াবলোকো পার্টিও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। ফলে নির্বাচনকে সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বলা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। 


রয়টার্স আরও জানিয়েছে, নির্বাচনের দ্বিতীয় দিনে রুশ কর্তৃপক্ষ অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থা ও যোগাযোগ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সাইবার হামলার খবর দিয়েছে। মস্কো দাবি করেছে, কিছু আক্রমণ প্রতিহত করা হয়েছে। তবে এসব হামলার পেছনে কারা ছিল, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। শনিবার বিকেল পর্যন্ত দেশব্যাপী ভোটার উপস্থিতি ৩২ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছিল বলে রুশ কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে। 


নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেনের রুশ-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে ভোট আয়োজন নিয়ে আন্তর্জাতিক আপত্তি রয়েছে। রাশিয়া এসব অঞ্চলকে নিজেদের অংশ হিসেবে দাবি করলেও ইউক্রেন ও অধিকাংশ আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র তা স্বীকার করে না। এবারের নির্বাচনে ওই অঞ্চলগুলোর বাসিন্দাদের অংশগ্রহণও তাই রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে। 


মলদোভার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায় রাশিয়ার ভোটকেন্দ্র স্থাপন নিয়েও কূটনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া সেখানে ১৫টি ভোটকেন্দ্র খোলার সিদ্ধান্ত নেয়, যা মলদোভা ‘অগ্রহণযোগ্য ও বৈরী’ পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেছে। মস্কো অবশ্য রুশ নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার যুক্তি দিয়েছে। 

বেলুসভের ক্ষেত্রে ভোটদানের ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ তিনি রাশিয়ার সামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা। ২০২৪ সালের মে মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তিনি রুশ প্রতিরক্ষা বাজেট, সামরিক উৎপাদন ও ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তার অর্থনীতি ও প্রশাসনিক পটভূমির কারণে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিয়োগটিও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বেলুসভের প্রকাশ্য ভোটদানকে তাই শুধু ব্যক্তিগত নাগরিক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার পাশাপাশি রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সামরিক নেতৃত্বের দৃশ্যমান অংশগ্রহণের দিক থেকেও দেখা হচ্ছে। তবে তার ভোটের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট দল বা প্রার্থীকে সমর্থন করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশ্যে জানা যায়নি।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর