চাকরি গেলেই বিপদ! এইচ-১বি কর্মীদের ৬০ দিনের সুযোগ বাতিল করতে ট্রাম্পের বড় পদক্ষেপ
চাকরি হারানোর পর এইচ-১বি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার ৬০ দিনের সুযোগ বাতিলের প্রস্তাব, কার্যকর হলে দ্রুত নতুন চাকরি বা বৈধ ব্যবস্থা নিতে হবে।
চাকরি গেলেই বিপদ! এইচ-১বি কর্মীদের ৬০ দিনের সুযোগ বাতিল করতে ট্রাম্পের বড় পদক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে এইচ-১বি ভিসাধারীরা চাকরি হারানোর পর বর্তমানে যে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের সময় পান, সেই সুযোগ আর নাও থাকতে পারে। ফলে কোনো বিদেশি কর্মীর চাকরি শেষ হয়ে গেলে নতুন নিয়োগকর্তা খোঁজা, ভিসার পৃষ্ঠপোষকতা পরিবর্তন করা কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য হাতে থাকা সময় নাটকীয়ভাবে কমে যেতে পারে।
রয়টার্সের ১০ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ নির্দিষ্ট কিছু অস্থায়ী কর্মভিসাধারীদের জন্য চালু থাকা ৬০ দিনের অবকাশ বাতিল করার প্রস্তাব করেছে। এই প্রস্তাবের আওতায় এইচ-১বি ছাড়াও আরও কয়েকটি কর্মভিসা পড়বে।
বর্তমান ব্যবস্থায় যোগ্য এইচ-১বি কর্মীর চাকরি শেষ হয়ে গেলে সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থেকে নতুন চাকরি বা নতুন নিয়োগকর্তা খোঁজার সুযোগ থাকে। এই সময়ের মধ্যে কর্মী নতুন নিয়োগকর্তার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অভিবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। একই সঙ্গে কেউ যদি যুক্তরাষ্ট্রে আর না থাকতে চান, তাহলে নিজের বাসাবাড়ি, সন্তানদের স্কুল, পরিবারের জিনিসপত্র এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত বিষয় গুছিয়ে দেশে ফেরার প্রস্তুতিও নিতে পারেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, এই ৬০ দিনের সুযোগ ২০১৭ সাল থেকে চালু রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন প্রস্তাব সেটি বাতিল করতে চায়। প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হলে চাকরি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট কর্মীর বৈধ অবস্থান নিয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এখনই এই নিয়ম কার্যকর হয়নি। এটি একটি প্রস্তাবিত বিধি। এর ওপর দুই মাসের জনমত গ্রহণের সময় থাকবে। এরপর প্রশাসন মতামত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাই বর্তমানে এইচ-১বি কর্মীদের জন্য বিদ্যমান ৬০ দিনের সুযোগ এখনো কার্যকর রয়েছে।
এই পরিবর্তন শুধু এইচ-১বি কর্মীদের জন্য নয়। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী ই-১, ই-২, এল-১, ও-১, টিএন, এইচ-১বি১ এবং ই-৩ ধরনের নির্দিষ্ট অস্থায়ী কর্মভিসাধারীরাও এর আওতায় পড়তে পারেন। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের বৈধ কর্মভিসায় থাকা বিদেশি পেশাজীবীদের ওপর এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে প্রযুক্তি, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য দক্ষ পেশার সঙ্গে যুক্ত বিদেশি কর্মীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় প্রযুক্তি ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিদেশি দক্ষ কর্মীদের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ডেলয়েট, পিডব্লিউসি, আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং এবং টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস, ইনফোসিস, এইচসিএল টেকনোলজিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, বিদেশি কর্মীদের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি ধরে রাখার সুযোগ থাকলে কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের চাকরির সুযোগ কমতে পারে। প্রশাসন মনে করছে, বিদেশি কর্মীর চাকরি শেষ হলে নিয়োগকর্তারা সমপর্যায়ের যোগ্য মার্কিন কর্মী নিয়োগের দিকে যেতে পারেন। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি আবার বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে চায়, তাহলে নির্দিষ্ট অভিবাসন আবেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
অন্যদিকে অভিবাসন আইনজীবী ও বিদেশি কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী মহল এই পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ চাকরি হারানোর পর নতুন নিয়োগকর্তা খুঁজে পাওয়া সবসময় সহজ নয়। একজন এইচ-১বি কর্মীর জন্য শুধু চাকরি পাওয়া যথেষ্ট নয়; নতুন নিয়োগকর্তাকে প্রয়োজনীয় অভিবাসন প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করতে হয়। ফলে চাকরি হারানোর পর কোনো কর্মীকে একই সময়ে নতুন চাকরি, নতুন পৃষ্ঠপোষক এবং অভিবাসন সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সামলাতে হতে পারে।
এর প্রভাব শুধু কর্মীর ওপর পড়বে না, তাঁর পুরো পরিবারের ওপরও পড়তে পারে। অনেক এইচ-১বি কর্মীর স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে তাঁদের সঙ্গে থাকেন। একজন কর্মীর চাকরি চলে গেলে পরিবারের বাসা, সন্তানের পড়াশোনা, স্বাস্থ্যবিমা, গাড়ির ঋণ, বাড়িভাড়া এবং অন্যান্য আর্থিক দায়িত্ব হঠাৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারে।
বিশেষ করে যেসব পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে, তাদের জন্য ৬০ দিনের সময় বাতিল হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। চাকরি হারানোর পর দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হলে বাড়ি বিক্রি, বাসা ছাড়ার ব্যবস্থা, সন্তানদের স্কুল পরিবর্তন, গাড়ি বিক্রি এবং দেশে ফেরার মতো বিষয় খুব অল্প সময়ের মধ্যে সামলাতে হতে পারে। রয়টার্সও উল্লেখ করেছে, বর্তমান ৬০ দিনের সুযোগ বিদেশি কর্মীদের এসব ব্যক্তিগত বিষয় গুছিয়ে নেওয়ার সময় দেয়।
তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের সামগ্রিক চিত্রও বিবেচনা করা প্রয়োজন। রয়টার্সের পৃথক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নতুন বেকার ভাতার আবেদন সামান্য কমে ২ লাখ ৬ হাজার হয়েছে। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ৬২ হাজার নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ শ্রমবাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে এটি আরও একটি কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের ভিসা সংক্রান্ত ব্যয় বাড়ানোসহ বিভিন্ন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ৬০ দিনের অবকাশ বাতিলের প্রস্তাব সেই বৃহত্তর নীতির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্যও এই খবরটি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি অংশ প্রযুক্তি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য দক্ষ পেশায় কাজ করেন। যাঁরা এইচ-১বি বা সংশ্লিষ্ট কর্মভিসায় রয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে চাকরি হারানোর পরিস্থিতিতে অভিবাসন অবস্থার ওপর দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে—যদি প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত নিয়মে পরিণত হয়।
তবে বাংলাদেশি বা অন্য কোনো বিদেশি কর্মীর জন্য এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। বর্তমানে ৬০ দিনের নিয়ম বাতিল হয়নি। প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া রয়েছে। তাই কর্মীদের উচিত সরকারি চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী নিজেদের অভিবাসন অবস্থা বোঝা এবং প্রয়োজন হলে যোগ্য অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া।