“আইনের শাসন কি চাপে? মব সহিংসতা-হত্যা-ধর্ষণে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা”
বর্তমান বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নের সূচক বেছে নিতে হলে “মব সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূতভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা”-কে সবচেয়ে ভয়াবহ সূচক হিসেবে ধরা যায়। কারণ এটি শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতা ও জনগণের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট—দুটিই একসঙ্গে নির্দেশ করে
“আইনের শাসন কি চাপে? মব সহিংসতা-হত্যা-ধর্ষণে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা”
বর্তমান বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নের সূচক বেছে নিতে হলে “মব সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূতভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা”-কে সবচেয়ে ভয়াবহ সূচক হিসেবে ধরা যায়৷ কারণ এটি শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতা ও জনগণের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট—দুটিই একসঙ্গে নির্দেশ করে।
কেন মব সহিংসতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক?
১. মানুষ পুলিশের বদলে নিজের হাতে বিচার নিচ্ছে
গুজব, চুরি, ছিনতাইয়ের অভিযোগ বা ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা হচ্ছে। ২০২৬ সালের একটি বিশ্লেষণে মে থেকে জুনের মধ্যে মব সহিংসতায় আহতের সংখ্যা ৭৭% বেড়েছে বলে Manabadhikar Shongskriti Foundation-এর তথ্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।
২. হত্যা ও মব সহিংসতা একই সঙ্গে জননিরাপত্তার সংকেত
The daily Star এ, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ১,১৪২টি হত্যা মামলা দায়ের হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা জনমনে নিরাপত্তাহীনতা বাড়াচ্ছে
৩. ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকেই মব সহিংসতা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের বিষয়
EUAA-এর বাংলাদেশ মূল্যায়নে ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতির সঙ্গে “wave of violent mob attacks”-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. অপরাধ বাড়া আর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়া এক জিনিস নয়
হত্যা বা ধর্ষণের সংখ্যা বেড়ে গেলে সেটি অপরাধ বৃদ্ধির সংকেত। কিন্তু মানুষ যদি পুলিশের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে গণপিটুনি দেয়, জনতা আসামি ধরে শাস্তি দেয় বা গুজবের ভিত্তিতে হামলা চালায়, তখন সেটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ওপর আরও গভীর আঘাত নির্দেশ করে।
দ্বিতীয় সবচেয়ে ভয়াবহ সূচক: হত্যা
হত্যা হলো সবচেয়ে সরাসরি “hard indicator”। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে হত্যার মামলা নিয়ে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার খবর এসেছে; জানুয়ারি থেকে জুনে মাসিক হত্যামামলা ২৯৪ থেকে ৩৪৪-এ উঠেছিল বলে পুলিশ পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিবেদনে জানানো হয় যা দৈনিক প্রথম আলো প্রকাশ করেছিল।
তবে হত্যার মামলার সংখ্যা দিয়ে পুরো পরিস্থিতি বিচারেও সতর্কতা দরকার। সরকার ২০২৫ সালে ব্যাখ্যা করেছিল যে ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আগের বছরের কিছু হত্যাকাণ্ডও নতুন করে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে, ফলে মামলা-সংখ্যা প্রকৃত ঘটনার সময়কালকে সবসময় প্রতিফলিত করে না।
তৃতীয় সূচক: ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতন
এটি সামাজিক নিরাপত্তার সবচেয়ে ভয়াবহ সূচকগুলোর একটি। UNICEF ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৫০টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা মিডিয়া ও স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনের মাধ্যমে নথিভুক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছিল এবং একই সময় শিশু হত্যা ও সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে under-reporting অত্যন্ত বেশি হতে পারে। তাই মামলা কমে গেলে সেটি অপরাধ কমেছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
সবচেয়ে ভয়াবহ সংকেত হবে যখন একই সঙ্গে—
মব সহিংসতা + হত্যা + ধর্ষণ/শিশু নির্যাতন + চাঁদাবাজি + পুলিশের ওপর হামলা + বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা একসঙ্গে দেখা যায়।
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানের বর্তমান তথ্যের আলোকে মব সহিংসতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ “systemic warning indicator”, আর হত্যা সবচেয়ে শক্তিশালী সরাসরি অপরাধ-সূচক।
একই সঙ্গে এটাও বলা জরুরি যে সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রও তুলে ধরেছে—২০২৬ সালের জুনে BSS জানায়, সর্বোচ্চ শাস্তিযোগ্য গুরুতর অপরাধের প্রবণতা কমেছে বলে প্রশাসনিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে। তবে সরকারি পরিসংখ্যান ও মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে যা নিয়ে অপরাধ বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষন : এস গোস্বামী, সিএসবি নিউজ ইউএসএ।