হেমায়েতপুরের আতঙ্ক ‘মুশা’: ক্ষমতা যার, মুশা তার!
হেমায়েতপুর, আমিনবাজার ও সাভার—এক নামেই কাঁপে এলাকা। কে এই “মুশা”, যার ক্ষমতা বদলায় সরকার বদলালে? চাঁদাবাজি, দখল, হামলা, হত্যা মামলা—সব অভিযোগের কেন্দ্রে এক রহস্যময় নাম। ভয়ে মুখ খুলতে চায় না ভুক্তভোগীরা, তবে নীরবতা ভাঙছে CSB News USA এর অনুসন্ধান।
হেমায়েতপুরের আতঙ্ক ‘মুশা’: ক্ষমতা যার, মুশা তার!
সাভার, আমিনবাজার ও হেমায়েতপুর—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার অপরাধ জগতের একক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মোশারফ হোসেন মুশা। এলাকাবাসীর ভাষায়, “ক্ষমতা যার, মুশা তার।” রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে দল বদলালেও অপরাধের ধরন বদলায়নি—বরং বেড়েছে বলেই অভিযোগ স্থানীয়দের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোশারফ হোসেন মুশার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, জমি দখল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, এমনকি প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার মতো ভয়ংকর কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। তার বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ থাকলেও চরম ভয়ের কারণে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না অধিকাংশ ভুক্তভোগী।
সরকার পতনের পরও স্বস্তি ফেরেনি
গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর হেমায়েতপুরবাসীর মধ্যে স্বস্তির প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সময়কার অপরাধী চক্রের হাতবদল হলেও অপরাধ রয়ে গেছে একই। নতুন করে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন মোশারফ হোসেন মুশা—যিনি একসময় আওয়ামী লীগ ঘেঁষা হলেও বর্তমানে বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচিত।
এক মাসেই সর্বত্র দখল
সূত্র মতে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে হেমায়েতপুর এলাকার ফুটপাত, ভ্রাম্যমাণ মার্কেট, কুলিবিট, বাসস্ট্যান্ড, বাজার-ঘাট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ কমিটি, গার্মেন্টস ঝুট ও হাউজিং ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, মোশারফ হোসেন মুশা ও তার পাঁচ ভাই মিলে নিজস্ব বাহিনী ব্যবহার করে এই এলাকায় একাধিক তাণ্ডব চালান।
বর্তমানে তিনি হেমায়েতপুর ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হিসেবে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ।
বক্তব্য নিতে গিয়ে বাধা
CSB News USA টিম অভিযুক্ত মোশারফ হোসেন মুশার বক্তব্য নিতে একাধিকবার মোবাইল ফোন ও বার্তার মাধ্যমে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ শনিবার রাত আনুমানিক ৭টায় তার বাড়িতে গেলে দেখা হয় তার ভাই শরিফুল হোসেন শরিফের সঙ্গে। তিনি নিজেকে একজন গণমাধ্যম প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন,
“ভাই বাসায় নেই। ভাইয়ের সব বিষয় আমিই দেখি। ভাইকে কোথাও কথা বলতে দিই না।”
স্কুলের নামে চাঁদা, টাকা যায় অন্যত্র
হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে জয়নাবাড়ি সড়ক ও হেমায়েতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের জমিতে নির্মিত মার্কেটের শতাধিক দোকান থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ। দোকানিরা জানান, স্কুলের নামে তোলা এই টাকা সরাসরি মোশারফ হোসেন মুশার কাছে যায়।
একজন ফুটপাত দোকানি বাদল হোসেন বলেন,
“দিনে মাইকিং করে চাঁদামুক্ত ঘোষণা দেয়, আর সন্ধ্যায় তারাই এসে টাকা তোলে।”
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ম্যানেজিং কমিটি বিলুপ্ত করলেও নতুন করে গঠিত কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন মুশার ভাই শরিফ ইসলাম।
ইন্টারনেট, ডিশ, ঝুট—সবখানে দখল
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হেমায়েতপুর এলাকায় লক্ষাধিক ইন্টারনেট ও ডিশ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করছেন মোশারফ হোসেন মুশা ও তার ভাই রকিব ও রাসেল। আমিনবাজারের টিমটেক্স গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা দখলের অভিযোগ রয়েছে তার ভাই শরিফের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের এজেআই গ্রুপ, ডেকো গ্রুপসহ আরও কয়েকটি কারখানার ঝুট দখলের চেষ্টা চলছে।
একসময় জাকির হোসেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ডিস ব্যবসা এখন ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি মেহেদি হাসানের দখলে।
কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসের রাজত্ব
আওয়ামী লীগ নেতা আনিস আহমেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ এখন রাসেল, রাকিব ও শরিফের হাতে। কিশোর গ্যাং, মাদকসেবী ও বখাটেদের ব্যবহার করে মারধর, হুমকি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে মুশা বাহিনী—এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
বহিষ্কার ও মামলা
২০২৫ সালের ৮ জুলাই দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও নীতি পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে মোশারফ হোসেন মুশাকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এর আগে, ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল আজিম আহমেদ রনির দায়ের করা মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে মোশারফ হোসেন মুশাও আসামি হন। ছাত্র হত্যা মামলায়ও তার নাম উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, একজন প্রভাবশালী সিনিয়র নেতার হস্তক্ষেপে সেই মামলা থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়—যা নিয়ে তার ভাই শরিফ প্রকাশ্যে গর্ব করেন।
ভুক্তভোগীদের আতঙ্ক
হামলার শিকার হোসেন বলেন,
“পুলিশ, আর্মি, র্যাব কিছুই করতে পারেনি। আমি এখনো আতঙ্কে আছি।”
আরিফ হোসেন বলেন,
“মুশা ও তার গ্যাং আমার হাত-পায়ের হাড় ভেঙে রাস্তায় ফেলে যায়। তারা ভেবেছিল আমি মারা গেছি।”
জামায়াতে ইসলামীর কর্মী মনির অভিযোগ করেন, মেডিকেল ক্যাম্প চলাকালে শরিফ ও তার লোকজন হামলা চালায়। এরপর থেকে তিনি এক মাস ধরে গৃহবন্দি।
বিএনপি নেতা বাহার বলেন,
“আমাকে ও আমার ভাতিজাকে বিনা কারণে মারধর করেছে। প্রশাসন থেকেও কোনো সুরক্ষা পাইনি।”
অভিযুক্তদের দাবি
অভিযোগের বিষয়ে শরিফুল হোসেন শরিফ বলেন,
“আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমরা বংশপরম্পরায় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে।”
তিনি দাবি করেন, কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভীর হস্তক্ষেপে ছাত্র হত্যা মামলা বাদ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি হাইকমান্ড জানে।
সাবেক চেয়ারম্যান জামাল সরকার বলেন,
“আমি কিছু বললে ঝামেলা হবে। তবে তদন্ত হলে অনেক কিছু বের হবে।”
অভিযুক্ত মোশারফ হোসেন মুশার বক্তব্য নিতে শেষ পর্যন্ত সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
উল্লেখ্য, এই অনুসন্ধানের ভিডিও ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য CSB News USA-এর সংরক্ষণে রয়েছে। নিয়মিত অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘খোলাচোখ’-এ বিস্তারিত প্রকাশ অব্যাহত থাকবে।