বাংলাদেশ আফগানিস্তান হবে না—এটা বাংলাদেশই থাকবে
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, নারীর অধিকার, ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ও সংস্কারের রাজনীতির অঙ্গীকার করে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে পরিবর্তন ও পুরোনো রাজনীতির মধ্যকার সিদ্ধান্তের দিন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ আফগানিস্তান হবে না—এটা বাংলাদেশই থাকবে
বাংলাদেশ আফগানিস্তান হবে না—এটা বাংলাদেশই থাকবে: নাহিদ ইসলামের স্পষ্ট বার্তা
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, নারীর অধিকার, ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সংস্কারের রাজনীতির অঙ্গীকার করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “বাংলাদেশ কখনোই আফগানিস্তান হবে না, এটা বাংলাদেশই থাকবে।” রোববার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া নির্বাচনী ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নাহিদ ইসলাম বলেন, সংখ্যালঘু হলেও কোনো নাগরিক যেন বৈষম্য বা সহিংসতার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখা হবে না। ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক–সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গায়, আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, বাংলাদেশ অনুকরণীয় হতে পারে মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো ধর্মানুরাগী উদারনৈতিক সমাজের, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ও নাগরিকতানির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “রাষ্ট্র কোনো ধর্ম চাপিয়ে দেবে না, আবার ধর্মীয় অনুভূতির প্রতিও অবজ্ঞা করবে না।”
নারীর অধিকার ও জিরো টলারেন্স নীতি
ভাষণে নারীর অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন নাহিদ ইসলাম। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যের কোনো স্থান নতুন বাংলাদেশে থাকবে না।
প্রশাসনিক সংস্কার ও গণপরিবহন ব্যবহারের ঘোষণা
সরকারি কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাহিদ বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা পরিবহনব্যবস্থা থাকবে না। মন্ত্রীদের সপ্তাহে অন্তত এক দিন এবং সচিবদের সপ্তাহে অন্তত দুই দিন সাধারণ গণপরিবহন ব্যবহার করতে হবে। এতে শাসক ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অর্থনীতি, পরিবেশ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা
নাহিদ ইসলাম স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি এবং প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সুনীল অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি পরিবেশদূষণ কমাতে পরিবেশ কর চালুর ঘোষণা দেন।
পরিবর্তনের রাজনীতি বনাম পুরোনো রাজনীতি
এনসিপি ও ১১-দলীয় ঐক্যের ১৮টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, “এতক্ষণ যা বললাম, তা আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন।” তিনি বলেন, গত দেড় বছরে কারা সংস্কারের বিরোধিতা করেছে এবং কারা পুরোনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে, তা জনগণ দেখেছে। এনসিপি পরিবর্তন ও সংস্কারের রাজনীতি চায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তরুণদের প্রতি আহ্বান
নাহিদ ইসলাম বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পরিবর্তন ও পুরোনো রাজনীতির মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ। তিনি তরুণ সমাজকে আবারও দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, “যদি ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যর্থ হয়, যদি সুষ্ঠু নির্বাচন না হয়, তাহলে ৫ আগস্টের বিপ্লব ব্যর্থ হবে।”
তিনি আরও বলেন, “৫ আগস্টের অর্জন ও আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিতে হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।” ভোটারদের উদ্দেশে তিনি সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং ভোটাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন।
বিচার, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্র সংস্কার
ভাষণে ফ্যাসিস্ট যুগে সংঘটিত গুম-খুন, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন নাহিদ ইসলাম। ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প লোপাটের অর্থ উদ্ধার ও বিচার, নতজানু কূটনীতির পরিবর্তে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এবং ১৮ বছরের বেশি তরুণ-তরুণীদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
১১-দলীয় ঐক্য ক্ষমতায় গেলে পুলিশ বাহিনীর কাঠামোগত সংস্কার ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে পুনর্গঠনের কথাও বলেন নাহিদ ইসলাম।
শেষ আহ্বান
ভাষণের শেষাংশে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা আমাদের অনভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা স্বীকার করছি। সবকিছু স্বীকার করেই আপনাদের কাছে আরেকবার সুযোগ চাইছি।” তিনি এনসিপি ও ১১-দলীয় জোটকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।