চিন্ময় দাস ইস্যু ও সংখ্যালঘু রাজনীতির ভবিষ্যৎ

চিন্ময় দাস ব্রাহ্মচারীর কারাবাস আজ আর একক কোনো আইনি ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশে বসবাসরত সনাতনী সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য ও রাজনৈতিক অনাস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি সংবেদনশীল প্রশ্ন—ভোট বর্জন কি সনাতনী সম্প্রদায়ের জন্য কোনো বাস্তব রাজনৈতিক বিকল্প হতে পারে?

PostImage

চিন্ময় দাস ইস্যু ও সংখ্যালঘু রাজনীতির ভবিষ্যৎ


চিন্ময় দাসের কারাবাস ও সনাতনী সম্প্রদায়

ভোট বর্জন কি বাস্তব রাজনৈতিক বিকল্প

একজন চিন্ময় দাস ব্রাহ্মচারীর জেলবন্দী জীবন আজ আর কেবল ব্যক্তিগত কোনো ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশে বসবাসরত পুরো সনাতনী সম্প্রদায়ের ক্ষোভ, আক্ষেপ ও রাজনৈতিক অনাস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে, হিন্দু সম্প্রদায় কি সত্যিই ভোট বর্জনের মতো কোনো কার্যকর রাজনৈতিক অবস্থানে যেতে পারবে।

৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে যেসব অধিকারভিত্তিক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল বাংলাদেশ সনাতনী জাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সুরক্ষার পাঁচ দফা দাবিতে পরিচালিত আন্দোলন। ১৯৭১ সালের পর এটিই ছিল সনাতনী সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও অধিকার আদায়ের প্রয়াস। দীর্ঘদিন ধরে তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছে নিজেদের নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছিল।

পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সরকারগুলোর কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ার হতাশা থেকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি এই আন্দোলনের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিলেন চিন্ময় দাস ব্রাহ্মচারী। তাঁর সাংগঠনিক দৃঢ়তা, নৈতিক অবস্থান ও একাগ্র নেতৃত্ব বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের সনাতনীদের একত্রিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু সরকারের বিভিন্ন মহলের কঠোর ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করার পথ বেছে নেয়। চিন্ময় দাস ব্রাহ্মচারীসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে ভুয়া পতাকা অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও চট্টগ্রাম আদালতে এক আইনজীবী হত্যা মামলায় তাঁর নাম যুক্ত করে পুনরায় তাঁকে কারাবন্দী করা হয়।

এই ঘটনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ও প্রতিবাদ দেখা গেলেও সরকার অবস্থান পরিবর্তন করেনি। বরং আন্দোলন দমনের কৌশল আরও কঠোর হয়েছে। আজও চিন্ময় দাস কারাগারে বন্দী। সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে যে আশা তৈরি হয়েছিল এই সরকার হয়তো ন্যায়বিচার করবে, তা ক্রমেই হতাশায় রূপ নিয়েছে।

সনাতনীরা রাজপথে নামতে চাইলে তাদের হুমকি, ভয়ভীতি ও রাজনৈতিকভাবে ভারতীয় কিংবা আওয়ামী দালাল আখ্যা দিয়ে আন্দোলন স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে একটি গভীর বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, এই দমন নীতির শিকার শুধু চিন্ময় দাস নন, কার্যত পুরো বাংলাদেশি সনাতনী সম্প্রদায়ই এক ধরনের অদৃশ্য কারাবন্দিত্বের মধ্যে রয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক দমন পীড়ন থাকলেও এমন সর্বব্যাপী কঠোরতা খুব কমই দেখা গেছে।

যদিও এখনো চিন্ময় দাসের মুক্তির দাবিতে বড় কোনো গণআন্দোলন গড়ে ওঠেনি, তবুও তাঁর প্রতি সম্প্রদায়ের উচ্চবিত্ত থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, তা বর্তমান সরকার এবং সরকারের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি বড় আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

এই বৈষম্য ও অনাস্থা থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের ভেতরে নির্বাচন বর্জনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছে। এটি সরকার ও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি স্পর্শকাতর ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা।

তবে বাস্তব প্রশ্ন হলো, এই ভোট বর্জন কতটা বাস্তবসম্মত।

১৯৭১ সালের ভয়াবহ দমন পীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ ও দেশত্যাগের অভিজ্ঞতা থেকে সনাতনী সম্প্রদায় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ওপর দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থে আস্থা রেখে এসেছে। বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প রাজনৈতিক সমর্থনের প্রবণতা দেখা গেলেও তা এখনও সীমিত।

এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করায় অন্যান্য দলের প্রার্থীদের পক্ষ থেকেও ভোট নিশ্চিত করার চাপ বাড়বে। ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো এবং নিজ নিজ প্রতীকে ভোট নিশ্চিত করার এই দ্বিমুখী চাপের মধ্যে হিন্দু সংখ্যালঘু ভোটাররাই সবচেয়ে বেশি টার্গেটে পরিণত হবে। সংখ্যালঘু নেতাদের মতে, ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত থাকলেও বা না থাকলেও হিন্দু ভোটাররা দুই অবস্থাতেই চাপের মুখে পড়বে।

আরও একটি বড় সমস্যা হলো নেতৃত্ব সংকট। হিন্দু সম্প্রদায়ের শীর্ষ পর্যায়ের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা আওয়ামী লীগঘেঁষা এবং বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। এর ফলে সম্প্রদায়ের ভেতরে সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো কার্যকর নেতৃত্বের অভাব দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভোট বর্জনের মতো কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

সবশেষে নিরাপত্তার প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় অনেক হিন্দু সংখ্যালঘু ভোটার নিজেদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হবে। স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, অনেক এলাকায় হিন্দু সংখ্যালঘুদের নির্বাচনী প্রচারণা ও জনসমাবেশে অংশ নিতে সরাসরি চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় ভোট বর্জনের আকাঙ্ক্ষা যত গভীরই হোক না কেন, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত।


এস গোস্বামী: রাজনৈতিক বিশ্লেষক