নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, অস্বীকৃত নির্বাচন—বাংলাদেশ কোন পথে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও উত্তাপ। নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছেন। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে তিনি “বর্জনের রাজনীতি” আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেছেন—এতে দেশ আরও গভীর বিভাজন ও অস্থিরতার দিকে যেতে পারে।
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, অস্বীকৃত নির্বাচন—বাংলাদেশ কোন পথে?
অপসারিত প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে “ক্ষোভ আরও গভীর করছে”।
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী শেখ হাসিনা আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করার পর তিনি এই অবস্থান নেন, যা দেশজুড়ে আরও গভীর রাজনৈতিক বিভাজন ও সম্ভাব্য অস্থিরতার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) বার্তা সংস্থায় প্রকাশিত এক বার্তায় হাসিনা বলেন,
“বর্জনের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া কোনো সরকার একটি বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না।”
২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে শত শত মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অনুপস্থিত অবস্থায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া হাসিনা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর সমালোচনা আরও জোরালো করেছেন। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই এই সমালোচনা তীব্র হয়েছে—যে নির্বাচন দেশটির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে।
এপিকে পাঠানো এক ইমেইলে সাবেক এই নেত্রী সতর্ক করে বলেন,
“প্রতিবার যখন জনগণের একটি বড় অংশকে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখন তা ক্ষোভ বাড়ায়, প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা ক্ষুণ্ন করে এবং ভবিষ্যতের অস্থিরতার ভিত্তি তৈরি করে।”
ভারতে নির্বাসনে থাকা হাসিনা আরও দাবি করেন, বর্তমান সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর দল—সাবেক শাসক আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দিয়ে—তাঁর লাখো সমর্থককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।
বাংলাদেশে ১২৭ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য। এই নির্বাচনকে গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটি প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
এই পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করছে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। একই সঙ্গে ভোটারদের সামনে একটি প্রস্তাবিত সাংবিধানিক গণভোটও রয়েছে, যেখানে ব্যাপক রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত।
গত সপ্তাহে রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য স্থানে নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, কয়েক সপ্তাহের সহিংস অস্থিরতার পর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে তিন দিন পর বাংলাদেশে ফিরে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন ইউনূস।
ইউনূস অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন—আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার পর এই নির্বাচন আদৌ গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে কি না।
গণভোট ঘিরেও নিরাপত্তা ও অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, কারণ এটি সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
ইউনূসের কার্যালয় এপিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করবে এবং কোনো ধরনের জবরদস্তি বা সহিংসতার মাধ্যমে ফল প্রভাবিত করতে দেবে না। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোকেও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান, ডিসেম্বর মাসে তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। তিনি বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং আসন্ন নির্বাচনে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
শুক্রবার হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন। দিল্লির একটি প্রেস ক্লাবে তিনি বলেন, ইউনূসের অধীনে বাংলাদেশ “কখনোই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে পাবে না।”
এই বক্তব্য অনলাইনে সম্প্রচার করা হয় এবং এক লাখেরও বেশি সমর্থক তা সরাসরি দেখেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাসিনার বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে জানায়, ভারত তাকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় তারা “বিস্মিত” ও “মর্মাহত”।
বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আসছে, তবে নয়াদিল্লি এখনো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ভারতের অতীতে হাসিনাকে সমর্থন দেওয়ার কারণে তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।