ত্রয়োদশ নির্বাচন কি ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ম্যান্ডেট’?

নির্বাচনের আগমুহূর্তে সংবিধান সংস্কারের বয়ান যখন থিঙ্কট্যাংকের মঞ্চ থেকে ধারাবাহিকভাবে উঠে আসছে, তখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর কেবল একটি রাজনৈতিক আয়োজন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অধ্যাপক আলী রীয়াজের বক্তব্যে সংসদকে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদে’ রূপান্তরের প্রস্তাব রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক মহলে কৌশলগত আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

PostImage

ত্রয়োদশ নির্বাচন কি ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ম্যান্ডেট’?


ত্রয়োদশ নির্বাচনকে ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ’ হিসেবে উপস্থাপন: আলী রীয়াজের বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক ও কৌশলগত আলোচনা

ঢাকা, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘ব্যতিক্রমী ও রূপান্তরমুখী অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় তিনি বলেন, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পুনর্গঠনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।


বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (BEI) আয়োজিত ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও সহিংসতা প্রতিরোধ: মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে’ শীর্ষক এই আলোচনায় আলী রীয়াজ ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ নির্বাচনকে একটি “ঐতিহাসিক বিচ্ছেদবিন্দু” হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, অতীতের ১২টি নির্বাচনের সঙ্গে এই নির্বাচনের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, যা রাজনৈতিক দল ও নীতিনির্ধারকদের অনুধাবন করা জরুরি।

দ্বৈত ভূমিকার সংসদ: সরকার ও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ- আলোচনায় আলী রীয়াজ একটি নতুন সাংবিধানিক কাঠামোর ধারণা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর স্বাভাবিক সংসদীয় কার্যক্রম—সরকার গঠন, রাষ্ট্র পরিচালনা ও বাজেট প্রণয়ন—চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একই সংসদ ১৮০ দিনের জন্য একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে পারে।

ক্ষমতা হস্তান্তর বা রাষ্ট্র পরিচালনায় এতে কোনো সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি হবে না বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, এই দ্বৈত ভূমিকা একটি পরিকল্পিত ও সময়সীমাবদ্ধ প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।


গণপরিষদীয় ক্ষমতা’ ও বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন: সংবিধান সংস্কারের আইনি দিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলী রীয়াজ ‘কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার’ বা গণপরিষদীয় ক্ষমতার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিদ্যমান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় সংস্কার আনতে গেলে সাধারণ সংসদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে ‘বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন’-এর কারণে আদালত যেন কোনো সাংবিধানিক সংস্কার বাতিল করতে না পারে, সে জন্য ত্রয়োদশ সংসদকে বিশেষ গণপরিষদীয় ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন। তাঁর মতে, এটি কোনো অপ্রয়োজনীয় জটিলতা নয়; বরং “স্থায়ী গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ”।

আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা: অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির। ইনস্টিটিউটের সম্মানিত ফেলো ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ফারুক সোবহান আলোচনায় বক্তব্য রাখেন। জরিপ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন চৌধুরী সামিউল হক। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ছিল, যা আয়োজনটিকে একটি ‘মাল্টি-স্টেকহোল্ডার প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে তুলে ধরে।

BEI ও আন্তর্জাতিক সংযোগ নিয়ে আলোচনা:বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও থিঙ্কট্যাংক হিসেবে পরিচিত, যা বাজারমুখী অর্থনীতি, নীতিগত সংস্কার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক কূটনীতিকরা এবং এটি নিয়মিতভাবে দেশি-বিদেশি থিঙ্কট্যাংকের সঙ্গে যৌথ কার্যক্রম পরিচালনা করে।

সমালোচক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে BEI-এর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা। এ প্রেক্ষাপটে আলী রীয়াজের সাংবিধানিক বয়ান ও রাজনৈতিক তৎপরতা এই মঞ্চ থেকে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপিত হওয়াকে কেউ কেউ নির্বাচনী ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক প্রভাবের সম্ভাব্য দিক হিসেবে দেখছেন।

আঞ্চলিক কৌশলগত প্রেক্ষাপট: বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, নির্বাচনপূর্ব এই সাংবিধানিক পুনর্গঠনমূলক বয়ান কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; বরং এর আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যের দিক থেকে বিষয়টি নজরদারির দাবি রাখে বলে মত প্রকাশ করা হচ্ছে।  

২৮ জানুয়ারির এই গোলটেবিল আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, অধ্যাপক আলী রীয়াজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একটি সীমিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে নিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পুনর্গঠনের সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করছেন। মার্কিন-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একটি থিঙ্কট্যাংকের মঞ্চ থেকে এই বয়ান তুলে ধরা হওয়ায় বিষয়টি এখন আর শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজরদারির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।