বিএনপি–জামায়াত: নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি নেপথ্যের সমঝোতার রাজনীতি?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের প্রকাশ্য অবস্থান ও বক্তব্য ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তারা কি সত্যিই একে অপরের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী, নাকি এটি কেবল সরকার গঠনের কৌশলগত সমঝোতার অংশ? ইতিহাস, মতাদর্শ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের বাধ্য করে।
বিএনপি–জামায়াত: নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি নেপথ্যের সমঝোতার রাজনীতি?
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মতাদর্শ কী বলে: আওয়ামী বিরোধী জোটের দীর্ঘ দিনের মিত্ররা একে অন্যের সঙ্গে যে নির্বাচনী আমেজে মেতে উঠেছে, বিএনপি ও জামায়াতের সেই সম্পর্ক আসলেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নাকি সরকার গঠনের মধ্যস্থতা তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক, আলোচনা ও সমালোচনা।
জামায়াতের রাজনৈতিক পুনর্বাসন: স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রম টিকিয়ে রেখেছে। আওয়ামী লীগ ও জামায়াত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যার যার ভূমিকার কারণে পারস্পরিক বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানে অবস্থান করায় তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ সবসময়ই দেশ ও জনগণের কাছে বিপরীতমুখী শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠার পটভূমি মূলত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দেশে মধ্যপন্থী রাজনীতির যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তাকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই গড়ে ওঠে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর জিয়াউর রহমান ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর স্বাধীনতা পরবর্তী যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, বিশেষ করে ১৯৭১ সালে জামায়াতের দেশবিরোধী ভূমিকার কারণে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, তা বাতিল করে পুনরায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ সৃষ্টি করেন।
তৎকালীন সময়ের অনেক বুদ্ধিজীবী মনে করেন, মূলত জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। ফলে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, তা তাদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ডে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
রাজনৈতিক জোট: জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির ঐতিহাসিক নৈকট্যের কারণে তারা বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। জামায়াত মূলত তাদের পূর্বের রাজনৈতিক আশ্রয় এবং ১৯৭১ সালের চরম বিরোধী শক্তি আওয়ামী লীগকে কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করার জন্য বিএনপির সঙ্গেই জোট করে এসেছে। ফলে ১৯৯১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিএনপি জামায়াত জোটে জামায়াত তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ একই এজেন্ডায় যুগপৎ আন্দোলন করলেও আদর্শগত বিরোধের কারণে কখনোই জামায়াতকে জোটসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেনি।
রাজনৈতিক মতাদর্শ: জিয়াউর রহমানের হাত ধরে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর পুনর্বাসনের যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়, তার আলোকে অনেকেই মনে করেন বিএনপির রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক মতাদর্শের একটি সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, জিয়াউর রহমান নিজের রাজনৈতিক বৈধতা বৃদ্ধি এবং ধর্মপ্রাণ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সমর্থন পেতে ইসলামি ভাষ্য ব্যবহার করতেন। তিনি প্রায়ই তার বক্তব্যে ইসলামি পরিভাষা ও আদর্শের উল্লেখ করতেন।
অনেকে মনে করেন, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়কার মুসলিম জাতীয়তাবাদের অনুপ্রেরণা থেকেই জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণার সৃষ্টি। অর্থাৎ বিএনপি নিজেদের মধ্যপন্থী দল হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইলেও দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি মূলত ইসলামি জাতীয়তাবাদ থেকে উৎসারিত। রাষ্ট্রনীতিতে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই আওয়ামী লীগ প্রবর্তিত ধর্মনিরপেক্ষ মডেলের বিরোধী।
আওয়ামী বিরোধিতা, ভারতবিরোধী অবস্থান এবং মওদুদী ইসলামি রাজনৈতিক বার্তার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান থেকে তারেক জিয়া এবং গোলাম আজম থেকে সফিকুর রহমান পর্যন্ত একই ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়।
কৌশলগত অবস্থান
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের মতো ভয়াবহ দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ডের পর জামায়াতে ইসলামীর জন্য স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফেরার একমাত্র বাস্তব সুযোগ ছিল বিএনপি। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর রাজনৈতিক ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে আদর্শিকভাবে কাছাকাছি একটি দলের প্রয়োজন ছিল এবং সেই জায়গায় বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতকে সহায়তা করে এসেছে।
জামায়াত চায় তাদের আদর্শ ও চিন্তাকে রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ায় প্রয়োগ করতে এবং ১৯৭১ সালে পরাজয়ের রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিতে। অপরদিকে বিএনপির লক্ষ্য রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া। এই দুই উদ্দেশ্য তখনই বাস্তবায়ন সম্ভব, যখন আওয়ামী লীগ ও একই মতাদর্শের শক্তির বিরুদ্ধে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলা যায়। এই বাস্তবতা থেকেই বিএনপি জামায়াত জোটের জন্ম এবং তার ধারাবাহিকতা।
বর্তমানে তাদের মধ্যে যে প্রকাশ্য ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে, অনেকের মতে তা মূলত আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার একটি কৌশলমাত্র। আদর্শিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জামায়াত ও বিএনপি একে অন্যের পরিপূরক শক্তি হিসেবেই বিবেচিত।
বিএনপি ও জামায়াতের ১৯৭১ পরবর্তী রাজনৈতিক নৈকট্য, জোট রাজনীতি, রাজনৈতিক ভাবধারা এবং কৌশলগত অবস্থানের মিলের কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন প্রকৃত অর্থে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। বরং এটি একই মতাদর্শের দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সরকার গঠনের একটি প্রক্রিয়া।