প্রশ্ন জটিল, সময় কম, সচেতনতা নেই—তবু রায় চাই! এ কেমন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া?

আগামী ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একযোগে আয়োজিত সরকারের প্রস্তাবিত গণভোট নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণভোট জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর কাঠামো, প্রশ্নের ধরন, প্রচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ভোটারদের প্রস্তুতির ঘাটতি এ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে নিরক্ষর ও বয়স্ক ভোটারদের মতপ্রকাশের সুযোগ, একাধিক মতের প্রতিফলনের অভাব এবং সরকারের ভূমিকাকে ঘিরে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা গণভোটকে জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেটের প্রতিফলন হিসেবে কতটা কার্যকর হবে—সে বিষয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে।

PostImage

প্রশ্ন জটিল, সময় কম, সচেতনতা নেই—তবু রায় চাই! এ কেমন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া?


আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এ সরকার যে গণভোটের আয়োজন করেছে, তা নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক রয়েছে। গণভোটে মানুষের মূল চেতনার প্রতিফলন কতটুকু ঘটবে, তা নিয়ে রয়েছে বিরাট শঙ্কা। এমন ভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম, যেখানে গণভোটের প্রশ্ন সম্পর্কে ভোটাররা একেবারেই অপরিচিত এবং এটি তাদের জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা। গণভোটে একাধিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ না রেখে শুধুমাত্র একটি উত্তর রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মতামতের ভিন্নতা থাকলেও ভোটাররা সঠিকভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে না। নিরক্ষর ও বয়স্ক ভোটারদের জন্য কোনো ধরনের সহায়তা ছাড়া যে ভোটই দেওয়া হোক না কেন, তা হবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সঙ্গে স্ববিরোধী ও অস্বচ্ছ। সেক্ষেত্রে এ ভোটগ্রহণ ৫ আগস্ট-পরবর্তী জনগণের যে ম্যান্ডেটের কথা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে প্রতারণামূলক এবং কোনো পক্ষের দ্বারা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার মতো কূটকৌশল বলে মনে হচ্ছে।


প্রশ্নের জটিলতা ও দুর্বোধ্যতা, পৃথক প্রশ্নের ক্ষেত্রে পৃথক মতামত প্রকাশের সুযোগের অভাব, সময়ের স্বল্পতা, গণভোট সম্পর্কে দুর্বোধ্যতা, সরকারের প্রতি গণভোট নিয়ে অনাস্থা, তুলনামূলকভাবে প্রচারের স্বল্পতা ও সচেতনতার অভাব—প্রভৃতি কারণে গণভোটের উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জটিল, অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত বলে মনে করছেন বিভিন্ন বিশিষ্টজন।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সের নাগরিকদের মধ্যে নিরক্ষরতার হার ৩৯.২৩ শতাংশ; তন্মধ্যে বেশিরভাগই যোগ্য ভোটার। এরা সাধারণত প্রতীক দেখে এবং নির্দিষ্ট দলের সমর্থক হিসেবে সেই প্রতীকেই ভোট দেয়। এই বিপুল সংখ্যক ভোটার কীভাবে গণভোটে তাদের মতামত প্রকাশ করবে, তা এখনো অস্পষ্ট।


গণভোটে যে প্রশ্ন রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কে অধিকাংশ ভোটারের স্পষ্ট ধারণা নেই; আবার ভিন্ন প্রশ্নের জন্য ভিন্ন মতামত দেওয়ার কোনো বিকল্পও রাখা হয়নি। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন ও উত্তরের মধ্যবর্তী যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা ভোটের দীর্ঘসূত্রতা বাড়াবে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করবে।


গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে হওয়ায় প্রার্থীরা নিজ নিজ ভোটের প্রচারে ব্যস্ত, যেখানে গণভোটের বিষয়ে নেই কোনো কার্যকর প্রচার, নেই পর্যাপ্ত সচেতনতা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাধ্য হয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার করছে, যা অসাংবিধানিক এবং সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থার পরিপন্থী। এর ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতা কিংবা সরকারের প্রতি কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের অসন্তোষ গণভোটের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে।


সর্বোপরি বলা যায়, গণভোটের প্রক্রিয়ার জটিলতা ও অস্বচ্ছতার কারণে যে উদ্দেশ্যে এটি আয়োজন করা হচ্ছে, তার প্রকৃত বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যাপক শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই জটিলতা ও অস্বচ্ছতার কারণে গণভোটের রায় নিয়ে অনেক ভোটারের মধ্যে এক ধরনের অনাগ্রহ ও সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। গণভোটের আগে এমন প্রবণতা বাড়তে থাকলে জুলাই সনদ থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইনি সকল প্রক্রিয়া গভীর সংকটে পড়ে যাবে। জুলাই আন্দোলনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের যে বিভিন্ন প্রস্তাব রয়েছে, তা ব্যাহত হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।


এস গোস্বামী - রাজনৈতিক বিশ্লেষক