সরকারি মদত চরমপন্থীদের, ভারতের উদ্বেগ সঠিক: শেখ হাসিনা
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, আসন্ন নির্বাচন এবং চরমপন্থা নিয়ে ভারতের অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।
সরকারি মদত চরমপন্থীদের, ভারতের উদ্বেগ সঠিক: শেখ হাসিনা
ডেস্ক রিপোর্ট | আন্তর্জাতিক রাজনীতি: বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের আর মাত্র ২৬ দিন বাকি। এমন এক সংকটময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই সময়-কে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা, নির্বাচন, গণতন্ত্র, চরমপন্থার উত্থান এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। পদচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে তাঁর দল আওয়ামি লিগের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ রয়েছে।
ভারতে অবস্থান ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক
ভারতে অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ভারত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ভারতের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ সময়েও এই সম্পর্ক অটুট থাকবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
চরমপন্থা ও ভারতের উদ্বেগ
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন, কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলা, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং ভারত-বিরোধী বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ভারতের উদ্বেগকে তিনি ‘সম্পূর্ণ যৌক্তিক’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, এসব ঘটনা বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা চরমপন্থী শক্তিগুলোর কাজ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বনাম স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি
শেখ হাসিনার দাবি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু বর্তমানে সেই চেতনার বিপরীতে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। গণতন্ত্র ক্ষয়, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ, নির্বিচার গ্রেপ্তার, নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন—এসব স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থানেরই প্রতিফলন। পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রচেষ্টাকে তিনি শহিদদের প্রতি অবমাননা বলেও আখ্যা দেন।
নির্বাচন ও আওয়ামি লিগের অংশগ্রহণ
ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত নির্বাচন নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর মতে, আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ রেখে কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হতে পারে না। বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, প্রকৃত বিকল্পের সুযোগ দিলে জনগণ আওয়ামি লিগকেই বেছে নেবে—এই আশঙ্কাতেই দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক না পাঠানোয় তিনি হতাশাও প্রকাশ করেন।
সমর্থকদের প্রতি বার্তা
দেশজুড়ে আওয়ামি লিগ সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ধরপাকড়ের অভিযোগ করে শেখ হাসিনা জানান, লক্ষাধিক নেতাকর্মী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় কারাবন্দি। তবু সমর্থকদের শান্ত, সংযত ও ধৈর্যশীল থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আতঙ্কের রাজত্ব কোনো সরকার দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে পারে না।
বর্তমান সংকটের দায় কার?
বর্তমান অরাজক পরিস্থিতির দায় তিনি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত চরমপন্থী শক্তিগুলোর ওপর চাপান। তাঁর ভাষায়, পরিকল্পিতভাবে দেশের অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে। বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান সংকুচিত এবং একসময়ের উন্নয়নের ধারায় বড় ধাক্কা লেগেছে।
দেশে ফেরার শর্ত
ঢাকায় ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য স্পষ্ট—সংবিধান ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা না হলে তাঁর ফেরা সম্ভব নয়। আওয়ামি লিগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং সত্যিকারের অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত হলেই তিনি দেশে ফেরার কথা বিবেচনা করবেন।
সার্বিকভাবে শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কেড়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।