জুলাই–আগস্ট ২০২৪: নিরীহ মানুষ নিহত, পুলিশ ও আওয়ামী লীগ কর্মী হেনস্থা, UN রিপোর্টে গুণতি ভুল!

ICRF-এর রিপোর্টে উঠে এসেছে, জাতিসংঘের OHCHR প্রতিবেদনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপেক্ষা, সাক্ষ্য অবহেলা এবং পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত। সাবেক আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করেছেন, নিরীহ মানুষ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর সহিংসতা আন্তর্জাতিক রিপোর্টে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

PostImage

জুলাই–আগস্ট ২০২৪: নিরীহ মানুষ নিহত, পুলিশ ও আওয়ামী লীগ কর্মী হেনস্থা, UN রিপোর্টে গুণতি ভুল!


নয়াদিল্লি | ১৭ জানুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট মাসে সংঘটিত সহিংসতা নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (OHCHR) প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন ও বিশদ আইনি পাল্টা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ICRF)।

শনিবার ভারতের নয়াদিল্লিতে প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে আইসিআরএফ, ল’ ভ্যালি সলিসিটর এবং এস শাকির (FRSA)-এর যৌথ উদ্যোগে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের একাধিক সাবেক মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ নেতা অংশ নেন।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বক্তব্য রাখেন আইসিআরএফের লিগ্যাল টিমের প্রধান, ব্যারিস্টার ও সলিসিটর নিজুম মজুমদার। তিনি বলেন, এই পাল্টা প্রতিবেদনটি ওএইচসিএইচআর রিপোর্টের আইনি ও তথ্যগত বিশ্লেষণের ফল।

তার মতে, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে গুরুতর কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে—যার মধ্যে আছে প্রমাণের নির্বাচিত ব্যবহার, তথ্য যাচাইয়ে স্বচ্ছতার অভাব, অভ্যন্তরীণ অসঙ্গতি, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য উপেক্ষা এবং তদন্তের সময়সীমা ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত করা। এসব ত্রুটি আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

নিজুম মজুমদার বলেন, জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নেয়নি এবং দলীয় ও পক্ষপাতদুষ্ট সূত্রের ওপর নির্ভর করেছে। পুলিশ, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের ওপর চালানো সহিংসতার বহু প্রমাণ উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এরপর বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তিনি বলেন, ওএইচসিএইচআর প্রতিবেদনটি একতরফা, তড়িঘড়ি প্রস্তুত এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য ছাড়াই চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি যে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে। পাঁচ ঘণ্টার ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি পুলিশি বলপ্রয়োগ সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালা ব্যাখ্যা করলেও তার কিছুই প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়নি।

“মনে হয়েছে, সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া ছিল। আমাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কেবল সেই সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার জন্য,” বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকারের ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমের তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা ও আটক রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য উপেক্ষা করা হয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর অভিযোগকে তিনি কারিগরি দিক থেকে অসম্ভব বলে উল্লেখ করেন।

পরবর্তীতে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাবেক প্রতিনিধি রবি আলম। তিনি বলেন, জুলাই–আগস্টের সহিংসতা ছিল সুপরিকল্পিত।

“নিরীহ মানুষ ও পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছে, স্নাইপার ছিল। অথচ দোষ চাপানো হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর,” বলেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ। তিনি আইসিআরএফকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এই প্রতিবেদন একটি পক্ষপাতদুষ্ট ও মনগড়া ওএইচসিএইচআর রিপোর্টের শক্তিশালী জবাব।

তিনি বলেন, ছাত্র মৃত্যুর ঘটনা তদন্তাধীন হলেও শত শত পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছে—যা প্রতিবেদনে গুরুত্ব পায়নি। নিহতদের শরীরে পাওয়া গুলির উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অপসারণ করা হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ড. মাহমুদ আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত মৃত্যুর সংখ্যার অসঙ্গতির কথা তুলে ধরেন। তার মতে, সরকারী গেজেটে প্রায় ৮০০ মৃত্যুর উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে দুর্ঘটনা ও অসংলগ্ন ঘটনাও রয়েছে। শতাধিক ব্যক্তি জীবিত ফিরে এসেছেন বলেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত সহিংসতার জন্য দায়ীদের দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়, পুলিশ ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ ওএইচসিএইচআর ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করেছে।

তিনি জানান, চার লক্ষাধিক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে এবং লক্ষাধিক এখনও কারাগারে রয়েছে। এ পরিস্থিতিকে তিনি রাজনৈতিক নিপীড়ন বলে অভিহিত করেন।

ড. মাহমুদ ঘোষণা দেন, ওএইচসিএইচআর প্রতিবেদন ও এর প্রণেতাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের মহাসচিবসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানানো হবে।

আয়োজকরা বলেন, এই পাল্টা প্রতিবেদন সহিংসতা অস্বীকার করে না; বরং সত্যের বিকৃতি, তথ্যের অপূর্ণতা ও নির্বাচিত জবাবদিহিতাকে চ্যালেঞ্জ করে একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানায়।

“ন্যায়বিচার হতে হবে পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও সত্যনির্ভর—রাজনৈতিক সুবিধাভিত্তিক নয়,”—বলেন তারা।