দ্বৈত নাগরিকত্বের ধোঁয়াশায় ২০২৬ নির্বাচন: প্রশ্নের মুখে বিএনপি নেতৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সামনে আসছে বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যানের দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত অস্পষ্টতা। এই আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন নির্বাচন প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করছে, যা নির্বাচনী মাঠে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দ্বৈত নাগরিকত্বের ধোঁয়াশায় ২০২৬ নির্বাচন: প্রশ্নের মুখে বিএনপি নেতৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা
এস গোস্বামী, ঢাকা: বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন করা। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর যদি কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়, তাহলে গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ মানুষের যে ম্যান্ডেট তৈরি হয়েছে তা বিনষ্ট হবে।
বাংলাদেশ সৃষ্টির পর যতগুলো নির্বাচন পরিপূর্ণ অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি, সেগুলো নিয়ে এখনও বিতর্ক বিদ্যমান। এসব নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে, এমনকি সরকার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই ভেঙে দিয়ে পুনরায় নির্বাচন দিতে হয়েছে। তাই এই নির্বাচন নিয়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে নানা ধরনের শঙ্কার গুঞ্জন প্রবলভাবে শোনা যাচ্ছে।
এই নির্বাচনে তিনটি বৃহৎ জোট অংশ নিচ্ছে—এনএপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির একটি অংশ। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় তারা ভোট বর্জন করেছে। মূলত ৫ আগস্ট পরবর্তী বিএনপি জোট ও জামায়াত জোটই এই নির্বাচনের প্রধান স্টেকহোল্ডার, যারা গণঅভ্যুত্থানের মূল দাবিদার হিসেবে নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব করছে।
বিএনপি জোটে বিএনপিই মূল শক্তি এবং তাদের জোটসঙ্গীরাও অনেকটাই বিএনপির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে জামায়াত জোটে ইসলামী দলগুলোর প্রাধান্য থাকায় তাদের ভোটারদের একটি শক্ত প্রভাব রয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে জোট পরবর্তী বিভিন্ন নির্বাচন জরিপে পূর্বের তুলনায় আনুপাতিক হারে জামায়াত এগিয়ে রয়েছে।
জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জোটভুক্ত রয়েছে, যারা এই জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এনসিপির প্রতি সরকার ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে একটি সহনশীলতা লক্ষ করা যাচ্ছে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের অভিমত। মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও সাংগঠনিকভাবে আগের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে।
বিএনপি অনেক আগেই নির্বাচন আয়োজনের জন্য চাপ দিলেও জামায়াত জোট নানা কারণে নির্বাচনমুখী ছিল না। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় জামায়াত এখন অনেকটাই এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ওপর নির্ভরশীল। জোট শরিকদের আসন ভাগাভাগির বিষয়টি এখনও অস্পষ্ট এবং এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে মতপার্থক্য রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে এনসিপি বা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নির্বাচন থেকে সরে গেলে জামায়াতও নির্বাচন বর্জনের পথে যেতে পারে। অন্যদিকে বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যানের বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে অস্পষ্টতা এবং নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ভোটের মাঠে জামায়াত জোটের তুলনায় বিএনপির দুর্বল অবস্থান জনমনে শঙ্কা তৈরি করছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, জামায়াত জোটের ভেতরে মতপার্থক্য বাড়লে নির্বাচন বয়কটের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এছাড়া জাতীয় পার্টির দুটি অংশও এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। তারা শুরু থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ করছে। গণঅভ্যুত্থানের দাবিদার কিছু স্টেকহোল্ডারের দ্বারা জাতীয় পার্টির ওপর সরাসরি হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা দাবি করে, যার বিরুদ্ধে সরকার কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি।
সাধারণত বড় কোনো নির্বাচন বয়কটের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো কিছু নির্দিষ্ট অভিযোগ তোলে। যেমন অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব, সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে অনাস্থা, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও হয়রানি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অভাব, নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা এবং আইনগতভাবে নির্বাচনকে অবৈধ মনে করার সুযোগ।
উপরোক্ত যে কোনো কারণে বড় কোনো দল নির্বাচন বয়কট করতে পারে। যেহেতু আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের একটি বৃহৎ দল হিসেবে এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না, সেক্ষেত্রে আরও কোনো বড় জোট নির্বাচন বর্জন করলে সেই নির্বাচন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বলে বিবেচিত হবে না। এতে করে ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক মহলে সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। পুনরায় সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির দাবি আরও জোরালো হবে।
আওয়ামী লীগের পতনের পর নির্বাচন ছাড়াই দলীয় মধ্যস্থতার ভিত্তিতে একটি সরকার গঠনের বিষয়েও বেশ আলোচনা ছিল। তাছাড়া বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে জোটে থাকায় অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তা মধ্যস্থতার ভিত্তিতে সাজানো নির্বাচন হতে পারে। বিগত সরকারের সময় জাতীয় পার্টি বিরোধীদলে থাকলেও সেটিকে জনগণ সাজানো বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নির্বাচিত বলেই মনে করত।
বিগত সরকার পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। এর ফলে নির্বাচনী নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সার্বিক জননিরাপত্তা গুরুতর হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। অনেক হামলা, ভাঙচুর ও জনক্ষতিকর ঘটনার সময় সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে পুলিশের ভূমিকা প্রায় অনুপস্থিত বললেই চলে। বাংলাদেশ পুলিশ চরমভাবে হত্যার শিকার হওয়ার পর সরকার কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় তাদের মধ্যে দায়িত্ব পালনে অনীহা ও ভয় লক্ষণীয়। অনেক পুলিশ সদস্য মনে করছেন, তারা নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের অধীনে কাজ করতে চান, অন্তর্বর্তী সরকারের দায় নিয়ে আবারও জনরোষের শিকার হতে চান না। অনেকেই মনে করছেন, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার সম্পন্ন করার পরই নির্বাচন হওয়া উচিত।
সর্বোপরি বলা যায়, নির্বাচনী নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক চাপ, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি দলীয় অনাস্থা, নির্বাচনের সাংবিধানিক বৈধতা, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অভাব এবং জোট শরিকদের সমঝোতার দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে নির্বাচন বানচালের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনস্বার্থে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজন করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ও সামগ্রিক অগ্রযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।