রেমিট্যান্সের বাইরে: নারীর অদৃশ্য ভূমিকা

সাধারণভাবে মনে করা হয়, নারীর আয় বাড়লে পরিবারে তার মর্যাদা ও সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে। কিন্তু নারী অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই ধারণা প্রায়ই বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। রেমিট্যান্স-নির্ভর পরিবারে অর্থনৈতিক অবদান রাখলেও নারীরা সামাজিক স্বীকৃতি, মানসিক নিরাপত্তা কিংবা পারিবারিক কর্তৃত্ব থেকে বঞ্চিত থাকেন। বাংলাদেশে নারীর শ্রম অভিবাসন কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি গভীর সামাজিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের প্রতিফলন—যা এই প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লিঙ্গ, অভিবাসন এবং পরিবারে নারীর ভূমিকার পুনর্বিন্যাস নিয়ে লিখেছেন: ফারজানা ফারায়েজী, উন্নয়নকর্মী

PostImage

রেমিট্যান্সের বাইরে: নারীর অদৃশ্য ভূমিকা


যদিও সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে নারীর আয় তার পারিবারিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে, নারী অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই ধারণা সবসময় সত্য নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ একটি পুরুষতান্ত্রিক, পিতৃতান্ত্রিক ও পিতৃবাসভিত্তিক সমাজ, যেখানে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ নারী-পুরুষের বিভাজনকে উৎসাহিত করে, শ্রমের কঠোর বিভাজন আরোপ করে এবং পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় (রওনক জাহান, ১৯৯৫)।

গ্রামীণ ও পুরুষতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে একজন নারীর বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কখনোই সহজ নয়। এমনকি পরিবার পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও নারীর অভিবাসন সিদ্ধান্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক নানা জটিলতার সঙ্গে জড়িত। এটি প্রমাণ করে যে, গৃহস্থালি গণ্ডির বাইরে সুযোগ খুঁজতে গিয়ে নারীরা এখনও প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক বাধার মুখোমুখি হন।

বিএমইটি-এর তথ্যমতে, ২০১৬ সালে বিদেশে কর্মসংস্থানে গিয়েছিলেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮ জন নারী। কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৮ জনে—প্রায় ৬৬ শতাংশ হ্রাস।

অনেক ক্ষেত্রে পুরো পরিবার একজন নারী অভিবাসীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে তার ওপর আর্থিক দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক প্রত্যাশার ভারও চাপিয়ে দেওয়া হয়। এতে তার ভূমিকা একদিকে অর্থনৈতিকভাবে চাপপূর্ণ, অন্যদিকে সামাজিকভাবে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়—যেখানে ক্ষমতায়ন ও শোষণ পাশাপাশি অবস্থান করে।

🔻 কীভাবে নারীরা অবমূল্যায়িত হন

বিয়ের পর নারীরা প্রায়ই অচেনা ও কঠিন পারিবারিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীরা পারিবারিক দায়িত্বে উদাসীন থাকেন, জুয়া বা মোবাইল আসক্তির মতো কাজে সময় নষ্ট করেন। এই হতাশাজনক বাস্তবতায় অনেক নারী নিজের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে গোপনে বিদেশে কাজের সিদ্ধান্ত নেন।

বিদেশে গিয়ে নারীরা প্রায়ই পুরো আয় দেশে পাঠান, যদিও অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাদের ধারণা সীমিত। ১১ শতাংশ নারী শ্রমিকের স্বামী তাদের পরিত্যাগ করেছেন এবং ২৬ শতাংশ নারী বৈবাহিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হয়েছেন। এটি নারীদের চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানকে তুলে ধরে।

দেশে ফিরে অনেক নারী শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক ট্রমা বয়ে আনেন, কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারেন না। পরিবারের সদস্যরা তাদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে, আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং শারীরিক নির্যাতন নারীদের আরও প্রান্তিক করে তোলে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একই পরিবারের অন্য নারী সদস্যরাও অনেক সময় নারী অভিবাসীর অবদান ও সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দেন না। এতে নারী নিজেই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ধারণ করে নিজের ক্ষমতা সীমিত করে ফেলেন।

সোনিয়া আক্তার (২৫), ওমানফেরত:
“পাঁচ বছর কাজ করেও আমার আয়ের কোনো হিসাব নেই। টাকা চাইলে মারধর করা হয়েছে। এখন মনে হয়, আমার জীবনের সেই সময়গুলো আর আমার নয়।”

মারজিয়া খাতুন (২৭), জর্ডানফেরত:
“বিদেশে খেয়ে না খেয়ে কাজ করেছি। দেশে ফিরে স্বামী আমাকে কাজ করতে দেয়নি। জুয়ায় টাকা নষ্ট করেছে। প্রতিদিন দুশ্চিন্তায় কাটে।”

সমাজে প্রভাব

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ৩৮ শতাংশ নারী ফেরত শ্রমিক সমাজে ‘নিম্ন শ্রেণির নারী’ হিসেবে বিবেচিত হন। ৫৫ শতাংশ শারীরিকভাবে অসুস্থ, ২৯ শতাংশ মানসিক রোগে ভুগছেন, অথচ ৮৭ শতাংশ কোনো চিকিৎসা পাননি।

এই অবহেলার মূল কারণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সামাজিক রীতি ও মানসিকতা। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ছাড়া কোনো উদ্যোগই কার্যকর হবে না।

এই অবমূল্যায়ন নারীদের আত্মমর্যাদা নষ্ট করে দেয়। তারা অসম আচরণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়—যাকে বলা হয় Internalized Oppression। এর ফল হিসেবে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা এবং শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়।


শিক্ষা ও আর্থিক স্বনির্ভরতা নারীর ক্ষমতায়নের ভিত্তি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিকতার পরিবর্তন—নারীর নিজের এবং সমাজের।

বিদেশফেরত নারীরা পরিবার ও সমাজ—দুই জায়গাতেই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হন। এই কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক বাধা দূর না হলে নারীর ক্ষমতায়ন অসম্ভব। নারীরা যতদিন নিজের অধিকার দাবি না করবেন এবং সমাজ যতদিন মানসিকতা বদলাবে না, ততদিন পরিবারে তাদের অবস্থান প্রান্তিকই থেকে যাবে।