স্বামীর পাশে চিরনিদ্রায় দেশনেত্রী: সংগ্রাম, আপসহীনতা ও বীরত্বের এক অনন্য অধ্যায়ের সমাপ্তি
গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় কণ্ঠ, রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার হয়ে কারাবন্দী জীবন—সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানে বিদায় নিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
স্বামীর পাশে চিরনিদ্রায় দেশনেত্রী: সংগ্রাম, আপসহীনতা ও বীরত্বের এক অনন্য অধ্যায়ের সমাপ্তি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যাঁর নাম উচ্চারিত হলেই সংগ্রাম, আপসহীনতা ও প্রতিরোধের ইতিহাস সামনে এসে দাঁড়ায়—সেই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে রইলেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে তাঁর সমাহিত হওয়া কেবল একটি দাফন নয়; এটি ছিল একটি রাজনৈতিক জীবনের প্রতীকী পরিসমাপ্তি।
সংগ্রামী জীবনের শুরুঃ
এক সময়ের গৃহিণী খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং একটি রক্তাক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি সামনে আসেন গণতন্ত্রকামী মানুষের ভরসা হয়ে। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা—প্রতিটি ধাপে তাঁর ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু প্রধানমন্ত্রীই হননি, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় নারী নেতৃত্বের এক শক্তিশালী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
আপসহীন রাজনীতি ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতাঃ
সমর্থকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস না করা।
ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট—হোক তা সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, ট্রানজিট কিংবা পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, এই আপসহীন অবস্থানই তাঁকে আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্কিত কিন্তু দৃঢ় চরিত্রে পরিণত করে।
রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও কারাবন্দী জীবনঃ
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে করুণ অধ্যায় আসে শেষের দিকে। সমর্থকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে তিনি রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার হন। দুর্বল স্বাস্থ্য সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় কারাবন্দী থাকা, চিকিৎসা নিয়ে টালবাহানা এবং মৌলিক মানবাধিকার প্রশ্নে উদাসীনতা—সব মিলিয়ে তাঁর কারাজীবন হয়ে ওঠে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য নজিরবিহীন।
এই সময়টিতে তিনি রাজনীতির ময়দানে না থাকলেও, তাঁর নীরব উপস্থিতিই বিরোধী রাজনীতির প্রতীক হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধাঃ
বিদায়ের প্রাক্কালে এবং পরবর্তীতে, দেশে ও বিদেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে যে সম্মান জানানো হয়, তা ছিল নজরকাড়া।
বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, কূটনৈতিক মহল এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা তাঁকে স্মরণ করেন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী নারী রাজনীতিক হিসেবে।
মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও শোকবার্তা আসে—যেখানে তাঁকে গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে এক দৃঢ় কণ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিদায়ের মুহূর্ত: ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকা জানাজাঃ
তাঁর জানাজা ও বিদায় ঘিরে দেশজুড়ে যে আবেগ ছড়িয়ে পড়ে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।
সমর্থকদের দাবি অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ জানাজার মধ্য দিয়ে জাতি তাঁকে বিদায় জানায়। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা–উপজেলা, এমনকি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এই শোকযাত্রায় শামিল হন।
এই বিদায় ছিল কেবল একজন নেত্রীর নয়—এটি ছিল একটি আদর্শ, একটি প্রতিরোধের রাজনীতির প্রতি সম্মান।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন, কিন্তু তিনি ছিলেন অস্বীকার করা যায় না এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা।
সংগ্রাম, কারাবাস, অপবাদ ও অসুস্থতার মধ্য দিয়েও তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা তাঁকে সমর্থকদের চোখে বীরত্বের প্রতীকে পরিণত করেছে।
আজ তিনি স্বামীর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত। কিন্তু তাঁর নাম, তাঁর সংগ্রাম এবং তাঁর আপসহীন রাজনীতি—তা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরজাগরুক হয়ে থাকবে।