দেশে জঙ্গিবাদ নেই—এই দাবির মুখে হাসনাবাদের বিস্ফোরণ নতুন করে উদ্বেগ বাড়াল
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নেই—এমন দাবি যখন কিছু মহল থেকে জোরালোভাবে তোলা হচ্ছে, ঠিক সেই সময় কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে একটি মাদ্রাসায় ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণ নতুন করে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসা তথ্য ও আলামত ইঙ্গিত দিচ্ছে, এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়; বরং চরমপন্থী কার্যক্রমের প্রস্তুতির অংশ হতে পারে। ফলে “সবই নাটক” বলার বয়ান এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট ফারাক ক্রমেই সামনে আসছে।
দেশে জঙ্গিবাদ নেই—এই দাবির মুখে হাসনাবাদের বিস্ফোরণ নতুন করে উদ্বেগ বাড়াল
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নেই—এমন দাবি সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে জোরালোভাবে তোলা হচ্ছে। এমনকি একটি প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকাও অতীতের জঙ্গি ঘটনাগুলোকে “নাটক” হিসেবে প্রমাণ করার প্রচেষ্টায় নেমেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় একটি মাদ্রাসায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ সেই দাবিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ: তদন্তে উঠে আসছে চরমপন্থার আলামত
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, হাসনাবাদের ওই মাদ্রাসায় যে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, সেটি কোনো দুর্ঘটনাজনিত গ্যাস লিক বা সাধারণ আগুনের ঘটনা নয়। প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, সেখানে আত্মঘাতী হামলায় ব্যবহৃত হতে পারে—এমন বিস্ফোরক সামগ্রী প্রস্তুতের চেষ্টা চলছিল। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া উপকরণ ও আলামত বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিষয়টিকে চরমপন্থী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তি ও অতীত সংশ্লিষ্টতা
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, ঘটনাটির সঙ্গে আল আমিন শেখ রাজিব নামের এক যুবকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি এর আগেও ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জ থেকে র্যাবের অভিযানে গ্রেফতার হয়েছিলেন বলে নিরাপত্তা সংস্থার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সে সময় তাকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা হয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। তবে অতীত রেকর্ড ও বর্তমান আলামত মিলিয়ে বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
জামিনে মুক্ত জঙ্গি সন্দেহভাজনরা: বড় প্রশ্ন রাষ্ট্রের জন্য
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জঙ্গি সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জামিনে মুক্তি পাওয়া একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। মামলার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষ্য সংকট ও বিচারিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চরমপন্থীরা আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন তারা।
একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন,
“জঙ্গিবাদ শুধু অস্ত্র হাতে হামলা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নেটওয়ার্ক ও আদর্শিক প্রস্তুতির বিষয়। তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।”
‘জঙ্গিবাদ নেই’—এই বয়ান কতটা দায়িত্বশীল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে জঙ্গিবাদ নেই—এমন একপেশে বয়ান বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। অতীতে হলি আর্টিজান, শোলাকিয়া, গুলশান, শিবগঞ্জসহ একাধিক ঘটনায় বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জঙ্গি সহিংসতার শিকার হয়েছে। এসব ঘটনাকে “নাটক” বলে উড়িয়ে দেওয়া শুধু নিহতদের প্রতি অবমাননাই নয়, ভবিষ্যৎ ঝুঁকিকেও অবহেলা করা।
উপসংহার
হাসনাবাদের ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দেয়—জঙ্গিবাদ কোনো কল্পনা নয়, বরং একটি বাস্তব ও চলমান হুমকি। এ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো বা দায়িত্বহীন বয়ান তৈরি করা রাষ্ট্র, সমাজ ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থার পাশাপাশি গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো—তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়া। কারণ ইতিহাস বলে, হুমকিকে অস্বীকার করলে তা দুর্বল হয় না—বরং আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে।