ব্রিটেনে বড়দিনের ট্যাক্সিতে তারেক রহমান—প্রবাসী বাংলাদেশিদের আশা-ভরসার প্রতিচ্ছবি
লন্ডনের বড়দিন মানেই নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই ট্যাক্সির ভেতর গমগম করছিল বাংলাদেশের রাজনীতি। তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে ঘিরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের যে আবেগ ও প্রত্যাশা, তা ধরা পড়েছে মিজানুর রহমান খানের লেখায়।
ব্রিটেনে বড়দিনের ট্যাক্সিতে তারেক রহমান—প্রবাসী বাংলাদেশিদের আশা-ভরসার প্রতিচ্ছবি
লন্ডন, যুক্তরাজ্য: ব্রিটেনে বছরে একদিনই এমন আসে, যেদিন প্রায় পুরো দেশ থেমে যায়। ২৫ ডিসেম্বর—ক্রিসমাস ডে। এদিন রাস্তায় চলে না কোনো বাস, ট্রেন কিংবা আন্ডারগ্রাউন্ড। কেবল হাসপাতাল ও গণমাধ্যমের মতো জরুরি সেবাগুলো সীমিত আকারে চালু থাকে। তবে দ্বিগুণ ভাড়ার সুযোগে রাস্তায় নামে ট্যাক্সি—বিশেষ করে উবার। আর সেই ট্যাক্সির চালকের আসনে বসেই যেন ধরা পড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক মনোজগতের এক স্পষ্ট ছবি।
বিবিসির লন্ডন অফিসে কর্মরত বাংলাদেশি সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান, বড়দিনে অফিস যাতায়াতের সময় এমনই এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। অফিস থেকে সরবরাহ করা ট্যাক্সির চালক—দুজনই বাংলাদেশি, দুজনই সিলেটি, আর আশ্চর্যজনকভাবে দুজনই ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবরে উচ্ছ্বসিত।
সকালের চালক প্রথম দেখাতেই অনুমান করে নেন যাত্রী বাংলাদেশি। এরপর প্রশ্ন—আইটি ইঞ্জিনিয়ার নাকি সাংবাদিক? সাংবাদিক পরিচয় শুনেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন,
“আজকের খবর দেখছেন? তারেক জিয়া তো দেশে গেছেন!”
এরপর শুরু হয় একটানা ‘ধারাভাষ্য’। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে মানুষের ভিড়, আবেগ, এমনকি তারেক রহমানের খালি পায়ে ঘাসে দাঁড়িয়ে থাকা—সবই যেন চোখের সামনে তুলে ধরেন তিনি। চালকের চোখেমুখে ছিল খাঁটি আনন্দ, আশার ঝিলিক।
রাতের ফেরার পথে আরেক চালক—আরও বেশি আবেগপ্রবণ। প্রতিবার তারেক রহমানের নাম উচ্চারণের সময় পেছনে তাকিয়ে যাত্রীর প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা। দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকলেও থামেনি তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। শুধু দেশে ফেরা নয়, লন্ডনে তারেক রহমানের জীবনযাপন, রাজনৈতিক যোগাযোগ, এমনকি পারিবারিক সম্পর্ক পর্যন্ত তুলে ধরেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে।
নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে স্বীকার না করলেও তিনি জানান, সারাদিন টিভির সামনে বসে তারেক রহমানের খবর দেখেছেন। তার বিশ্বাস—
“তারেক জিয়ার একটা প্ল্যান আছে। ১৭ বছর এই দেশে ছিল। অনেক আইডিয়া নিয়ে গেছে। বুড়াদের কথা শুনবে না।”
এই কথাগুলো শুধু একজন উবার চালকের নয়, বরং বহু প্রবাসী বাংলাদেশির মনোভাবের প্রতিফলন—যারা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত না থেকেও দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে গভীর আগ্রহ ও প্রত্যাশা রাখেন।
মিজানুর রহমান খানের লেখায় উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—প্রবাসী সমাজে রাজনৈতিক আলোচনা কতটা ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে মিশে যায়। চালক যাত্রীর পড়াশোনা, বাড়ির মালিকানা, স্ত্রীর পেশা, এমনকি জেলার পরিচয় জেনেও রাজনৈতিক আলাপে ফেরেন অনায়াসে। আবার রাজনীতিতেই ফিরে গিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন—
“পারবেন, অবশ্যই পারবেন। ওনার যে স্পিড দেখলাম, কিছু একটা করবেন।”
একই দিনে, একই শহরে, দুজন ভিন্ন মানুষ—কিন্তু অনুভূতি এক। এই মিল কাকতালীয় নয় বলেই মনে করেন লেখক। বরং এটি ইঙ্গিত করে যে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক বড় অংশের মধ্যে নতুন করে আশা ও আস্থার জন্ম দিয়েছে।
প্রশ্ন থেকেই যায়—অতীতের বিতর্ক, ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক বিভাজন পেছনে ফেলে তারেক রহমান কি এই প্রত্যাশার মূল্য দিতে পারবেন?
প্রবাসী বাংলাদেশিদের যে ভালোবাসা ও ভরসা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে লন্ডনের বড়দিনের ট্যাক্সিতে—তা কি রূপ নেবে বাস্তব রাজনৈতিক পরিবর্তনে?
মিজানুর রহমানের এই লেখনী মূলত একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা হলেও, তা পরিণত হয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক মানসিকতার এক জীবন্ত দলিলে—যেখানে আশা আছে, বিশ্বাস আছে, আবার প্রশ্নও রয়ে গেছে।