বাংলাদেশের হৃদয়ে চিরকাল জ্বলবে হাদীর বীরত্বের মন্ত্র
ঢাকার শাহবাগে ইতিহাসের একটি স্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী থাকল লাখো মানুষ। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়ের প্রতীক, বিপ্লবী নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যার প্রতিবাদে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে দেওয়া ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম, সরকারের ওপর জনসচেতনতার চাপ, এবং তার চিরশেষ বিদায়ের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায় লেখা হলো। হাদির জীবন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, নেতৃত্ব ও আন্দোলনের প্রতীক ছিল। তাঁর হত্যার পরও শাহবাগে সমাবেশ, জানাজা ও জাতীয় কবির পাশে সমাহিত হওয়া সমস্ত প্রক্রিয়া দেখিয়েছে, যে হাদির আদর্শ, শিক্ষা এবং মন্ত্র চিরকাল দেশের মানুষের মনে অমর হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের হৃদয়ে চিরকাল জ্বলবে হাদীর বীরত্বের মন্ত্র
ঢাকা, ২০৫৫ – দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লিখলেন বিপ্লবী নেতা ওসমান বিন হাদী। ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে হামলার শিকার হওয়া এই রাজনীতিক তিনদিনের চিকিৎসার পর ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে আজ রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম: খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সমাবেশ
শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে শাহবাগে এক প্রতিক্রিয়াশীল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের জানান, সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের অগ্রগতি জানাতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাব না দিলে তাদের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।
আল জাবের বলেন, “এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও খুনিদের ধরা হয়নি। আমাদের দাবি পরিষ্কার—খুনি, পরিকল্পনাকারী ও সহায়তাকারীসহ পুরো চক্রকে বিচারের আওতায় আনা হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে পদত্যাগ বাধ্যতামূলক।”
সমাবেশে তিনি আরও বলেন, “জীবন দিয়ে দেব, তবু ইনসাফের লড়াই ছাড়ব না। বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব থাকবে, ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে; নয়তো আমরা রক্ত দিতে প্রস্তুত।” সমাবেশে অংশ নেওয়া মানুষকে তিনি শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
সরকারের ওপর চাপ: আন্দোলন ও রাজনৈতিক নির্দেশনা
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির হত্যার প্রেক্ষাপটে আন্দোলনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। আল জাবের এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্যান্য নেতারা সরকারের ওপর জনসচেতনতার মাধ্যমে চাপ তৈরি করছেন। অধ্যাপক ইউনূস জানাজার সময় বলেন, “বীর ওসমান হাদি, তোমাকে বিদায় দিতে আসিনি। তুমি চিরদিন আমাদের বুকের ভেতরে আছ এবং দেশের মানুষের মনোজগতে অমর হয়ে থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, হাদি দেশের মানুষকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা, প্রচারণা, মানুষকে সম্মান দেখানো ও বিনীতভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। এই শিক্ষা এবং হাদির মন্ত্র দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য দিশা হয়ে থাকবে।
ইনকিলাব মঞ্চের তরফে শাহবাগে অনুষ্ঠিত সমাবেশ চলাকালীন সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়, তবে সমাবেশ শেষে বিকেল ৬টার দিকে পুনরায় স্বাভাবিক হয়। সমাবেশে অংশগ্রহণকারী হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে অংশ নেন।
জাতীয় কবির পাশে সমাহিত: শেষ বিদায়
আজ শনিবার বিকেল ৪টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে ওসমান হাদির দাফন সম্পন্ন হয়। জানাজার আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও লাখো মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
ওসমান হাদির দাফন শেষে তার কফিন নিয়ে মিছিল শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে। এক ঘণ্টার মধ্যেই সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে তিনি নজরুলের সমাধির পাশে সমাহিত হন। সমাহিত হওয়ার পরও হাজারো মানুষ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান উচ্চারণ করেন।
শহীদ ওসমান হাদির রাজনৈতিক অবদান
শহীদ ওসমান হাদি ছিলেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মুখ। তিনি সক্রিয়ভাবে ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করেন এবং ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে একটি শক্তিশালী সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করেন। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তিনি নতুন প্রজন্মকে আন্দোলনের পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরপরই তিনি ঢাকার মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, এই আন্দোলনের জন্যই ১২ ডিসেম্বর হামলার শিকার হন।
ওসমান হাদির মৃত্যু শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু নয়, এটি দেশের ন্যায় এবং স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলনের চেতনার প্রতীক। ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম, সরকারের ওপর চাপ এবং জাতীয় কবির পাশে সমাহিত—এই তিনটি বিষয় একত্রে প্রমাণ করছে যে, হাদির স্মরণে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক আন্দোলন ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে।