ছায়ানট ভাঙচুর শুধু বাঙালি সংস্কৃতি নয় মুক্তিযুদ্ধের স্তম্ভ ভাঙার ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র
ছায়ানট ভাঙচুরের ঘটনা কোনো সাধারণ আইনশৃঙ্খলা সমস্যা নয়, কিংবা আকস্মিক আবেগের বহিঃপ্রকাশও নয়। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাংস্কৃতিক চেতনার ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলমান আঘাতেরই সাম্প্রতিক প্রকাশ। বাঙালি জাতিসত্তা, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ এবং স্বাধীনতার আদর্শকে দুর্বল করার যে সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া চলছে—ছায়ানটকে লক্ষ্যবস্তু করা সেই বৃহত্তর নীলনকশার অংশ। এই বাস্তবতা অস্বীকার করা মানে ইতিহাসকেই অস্বীকার করা।
ছায়ানট ভাঙচুর শুধু বাঙালি সংস্কৃতি নয় মুক্তিযুদ্ধের স্তম্ভ ভাঙার ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র
বাংলাদেশে ছায়ানট ভাঙচুরের সাম্প্রতিক ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি শুধু বাঙালি সংস্কৃতির ওপর হামলা নয় বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ইতিহাস ও আদর্শিক ভিত্তিকে ধ্বংস করার একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ। যারা এটিকে নিছক ভাঙচুর বা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে চালিয়ে দিতে চাইছে তারা হয় ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ নয়তো সচেতনভাবেই সত্য আড়াল করছে।
ছায়ানট শুধু একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়। এটি পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালি জাতিসত্তা ধ্বংসের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। ভাষা গান রবীন্দ্রনাথ এবং বাঙালিত্বকে নিষিদ্ধ করার পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে ছায়ানট ছিল এক নির্ভীক সাংস্কৃতিক ব্যারিকেড। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে যে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রকাশ ঘটেছিল সেটিই পরবর্তীতে রাজনৈতিক সংগ্রামের শক্ত ভিত তৈরি করে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানবিরোধী যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের সমান্তরালে গড়ে উঠেছিল তার শীর্ষ সারিতেই ছিলেন ছায়ানটের নেতৃস্থানীয় কর্মী ও শিল্পীরা। তারা শুধু মঞ্চে গান গেয়ে দায়িত্ব শেষ করেননি। মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা গঠন করে দেশাত্মবোধক গান গণসংগীত ও প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত করেছেন উজ্জীবিত করেছেন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের ন্যায্য সংগ্রামের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।
ছায়ানটের বহু সক্রিয় সদস্য সরাসরি সম্মুখ গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ডা. সারওয়ার আলী সাইফউদ্দিন আহম্মেদ মানিক কামরুল আলম খানসহ অনেকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। আবার ওয়াহিদুল হক ও সানজিদা খাতুনের নেতৃত্বে লুবনা মারিয়াম শাহিন সামাদ বিপুল ভট্টাচার্যের মতো শিল্পীরা মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে অবস্থান করে গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল দৃঢ় রেখেছেন। তারা প্রমাণ করেছেন সাংস্কৃতিক সংগ্রাম যুদ্ধের বাইরের কিছু নয় বরং যুদ্ধেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
স্বাধীনতার পর ছায়ানট প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাঙালি সংস্কৃতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যুক্ত রাখার দায়িত্ব পালন করে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ষাটের দশকের সাংস্কৃতিক আন্দোলন থেকে একাত্তরের রণাঙ্গন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম এই পুরো ধারাবাহিক ইতিহাসে ছায়ানট এক সংগ্রামী সঙ্গী ও পরিপূরক শক্তি। তাই ছায়ানটকে আঘাত করা মানে কেবল একটি সংগঠনকে নয় এই ইতিহাসকেই আঘাত করা।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সাধারণ জনতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সংস্কৃতিবিরোধী ও স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী শক্তির প্রবল উত্থান এখন মিডিয়া ও রাজপথে স্পষ্ট। তারা কৌশলগতভাবে ভারতবিরোধিতাকে সামনে এনে মূলত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষের সব স্তম্ভকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। এই ভারতবিরোধিতা প্রকৃতপক্ষে লোক দেখানো একটি মুখোশ যার আড়ালে জিহাদি জঙ্গি ও মৌলবাদী অপশক্তি তাদের পুরনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছে।
হাদীর মৃত্যু বা তাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আবেগকে ব্যবহার করা হয়েছে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে। বাস্তবতা হলো হাদী বেঁচে থাকলে ভারতবিরোধিতার নামে ছায়ানট ভাঙার মতো কাজে মানুষকে উসকানি দিতেন এমন কোনো নজির নেই। এত দিন সেটি ঘটেওনি। কিন্তু তার মৃত্যুর পর একটি অদৃশ্য কালোশক্তি পরিকল্পিতভাবে এই আবেগকে কাজে লাগিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। এটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ নয় বরং একটি সুস্পষ্ট নীলনকশার বাস্তবায়ন।
এই নীলনকশার লক্ষ্য স্পষ্ট। মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ভিত্তি দুর্বল করা বাঙালি জাতিসত্তার আত্মবিশ্বাস ভাঙা এবং ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে তার জন্মদর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন করা। ছায়ানট ভাঙচুর সেই বৃহৎ আক্রমণের একটি মাত্র ধাপ।
আজ যদি ছায়ানটকে রক্ষা করা না যায় আগামীকাল আঘাত আসবে অন্য কোনো সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক স্তম্ভে। তাই এই ঘটনা শুধু নিন্দার বিষয় নয় এটি প্রতিরোধের আহ্বান। ছায়ানটের পক্ষে দাঁড়ানো মানে কেবল একটি সংগঠনের পক্ষে দাঁড়ানো নয় বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাঙালি সংস্কৃতি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
এস গোস্বামী
রাজনৈতিক বিশ্লেষক