ভারত অসন্তুষ্ট হলে বাংলাদেশের ক্ষতি কতটা গভীর হতে পারে?

ভারত যদি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভাষ্য ও কূটনৈতিক আচরণকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে তার প্রতিফলন শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নয়—বাংলাদেশের অর্থনীতি, কূটনীতি ও আঞ্চলিক অবস্থানেও পড়তে পারে গভীর প্রভাব।

PostImage

ভারত অসন্তুষ্ট হলে বাংলাদেশের ক্ষতি কতটা গভীর হতে পারে?


ভারতের রাজধানী দিল্লির কূটনৈতিক মহলে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে যে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেল, তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে ঐতিহাসিক মৈত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণে ব্যস্ত বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা, অন্যদিকে ঠিক পরদিনই বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে সাউথ ব্লকে তলব—এই দুই দৃশ্যই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে দিল্লি–ঢাকা সম্পর্ক এখন আর আগের মতো স্বস্তিকর জায়গায় নেই।

ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস ঘিরে ‘কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠীর’ নিরাপত্তা হুমকির কারণেই এই সমন। তবে কূটনৈতিক সূত্রের ইঙ্গিত, বাংলাদেশের কয়েকজন রাজনীতিবিদের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য ভারতবিরোধী বক্তব্যও দিল্লির উদ্বেগকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন নিজেই স্বীকার করেছেন—এই সরকারের শুরু থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন বিদ্যমান। তাঁর বক্তব্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সদিচ্ছার কথা থাকলেও, বাস্তবতা হলো দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার জায়গাটি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

ভারত যদি বাংলাদেশকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখতে শুরু করে—তাহলে কী কী ক্ষতি হতে পারে?

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত যদি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি বা কূটনৈতিক ভাষাকে নিজেদের স্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে, তাহলে তার প্রভাব হবে বহুমাত্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী।

১. কূটনৈতিক স্তরে চাপ বৃদ্ধি
ভারত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশের জন্য সহযোগিতামূলক ভূমিকা সীমিত করতে পারে। জাতিসংঘ, বিমসটেক বা অন্যান্য আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে ভারতের নীরবতা বা অনাগ্রহও বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

২. নিরাপত্তা ও সীমান্ত ইস্যুতে কঠোরতা
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ভারত আরও কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে। সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি, নজরদারি জোরদার কিংবা অপ্রত্যাশিত কূটনৈতিক বার্তা—সবই দুই দেশের সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

৩. অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষতি
ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ট্রানজিট সুবিধা, আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া বা অশুল্ক বাধা—এসব ক্ষেত্রে ভারতের কঠোর অবস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে পোশাক শিল্প ও ভোক্তা পণ্যের ক্ষেত্রে।

৪. আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হওয়া
ভারত যদি বাংলাদেশকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিবেশী’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে দিল্লি বিকল্প কৌশলগত অংশীদারদের দিকে ঝুঁকতে পারে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

৫. অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরোক্ষ প্রভাব
ভারতীয় উদ্বেগকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে বাংলাদেশকে ‘অস্থিতিশীল’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে, তা বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও বৈদেশিক আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সংকট না কি সতর্কবার্তা?

বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক সরাসরি সংকট না বলে একটি কৌশলগত সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। ভারতের বার্তা স্পষ্ট—ঢাকাকে শুধু সদিচ্ছা নয়, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভাষাও নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে সার্বভৌম রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখা, অন্যদিকে এমন কোনো পদক্ষেপ বা বক্তব্য এড়িয়ে চলা, যা প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে নিরাপত্তাগতভাবে বিচলিত করতে পারে।

একাত্তরের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস ও দীর্ঘদিনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা থাকা সত্ত্বেও, বর্তমান বাস্তবতা বলছে—দিল্লি–ঢাকা সম্পর্ক এখন একটি সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সন্ধিক্ষণে সামান্য ভুল হিসাবও বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।