‘ভারতের বিজয়’ মন্তব্যে প্রশ্নের মুখে ১৯৭১-এর ইতিহাস
বাংলাদেশের বিজয় দিবস উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট ঘিরে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে “ভারতের ঐতিহাসিক বিজয়” হিসেবে উল্লেখ করায় অনেক বাংলাদেশি একে ইতিহাস বিকৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগকে খাটো করার প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন।
‘ভারতের বিজয়’ মন্তব্যে প্রশ্নের মুখে ১৯৭১-এর ইতিহাস
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্ট ঘিরে বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে মোদি ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে “ভারতের ঐতিহাসিক বিজয়” হিসেবে উল্লেখ করায় বহু বাংলাদেশি ব্যবহারকারী তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
মোদি তার পোস্টে লেখেন, “On Vijay Diwas, we remember the brave soldiers whose courage and sacrifice ensured India had a historic victory in 1971… Their heroism continues to inspire generations of Indians.”
পোস্টটিতে বাংলাদেশের নাম বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা সরাসরি উল্লেখ না থাকায় অনেকেই একে ইতিহাস বিকৃতি ও বাংলাদেশের আত্মত্যাগকে খাটো করে দেখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
পোস্টটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। শামীম হোসেন নামে একজন মন্তব্য করেন,
“চা বিক্রি কম হওয়ায় আজকে কম দামের মাল খেয়েছেন নাকি?”
ডাক্তার মসি নামের এক ব্যবহারকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন,
“U rubbish prime minister… you should shame on saying this.”
শাহেদ মাহমুদ লিখেছেন,
“This is not Indian victory, Mr. Modi. Bangladesh is an independent sovereign country achieved through the blood of freedom-loving people. You have no right to insult this great achievement.”
তিনি আরও বলেন, ভারত সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখেছে—কিন্তু বিজয়ের মালিকানা দাবি করা ইতিহাসের প্রতি অসম্মান।
তবে মোদির বক্তব্যের পক্ষে মতও দিয়েছেন কেউ কেউ। উত্তম পাটোয়ারী নামে একজন লেখেন,
“৭১–এ ভারত পাশে না দাঁড়ালে বাংলাদেশ নামক কোনো রাষ্ট্রের জন্মই হতো না। তাই একজন বাংলাদেশি হিসেবে ভারতের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।”
এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে আরেকজন লেখেন,
“গুড় আমার, চিনি আমার, পানি আমার—শুধু একটু শরবত টেস্ট করেছে বলে যদি পুরো শরবতের ক্রেডিট তাকে দিই, তাহলে কেমন হয়?”
মাহমুদুল শফিন নামে এক ব্যবহারকারী বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে লেখেন,
১৯৭১ কোনো ভারতীয় যুদ্ধ নয়, এটি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাস ধরে বাংলাদেশের জনগণ গণহত্যা ও দমন–পীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। ভারতের শেষ পর্যায়ের সামরিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সহায়তা কখনোই মালিকানার সমান নয়। বিজয়ের প্রকৃত মালিক বাংলাদেশের জনগণ, যারা চূড়ান্ত আত্মত্যাগ করেছে।
আহসান উল্লাহ সুমন লিখেছেন,
“The victory is ours. We fought, we sacrificed our lives. We won — not Indians. But we are grateful to Indians for supporting us.”
অন্যদিকে, ভাষার নামে একজন লিখেছেন,
ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ বিজয় হিসেবেই বিষয়টি দেখা উচিত। তার মতে, বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে ভারতও দুই পাশ থেকে পাকিস্তানের চাপে শান্তিতে থাকতে পারত না।
প্রধানমন্ত্রী মোদির পোস্টের বিরোধিতা করতে গিয়ে সাইদুর রহমান সাগর মাওলানা ভাসানীর একটি উক্তি তুলে ধরেন, যেখানে তিনি বলেছিলেন—
“আসাম আমার, পশ্চিমবঙ্গ আমার, ত্রিপুরাও আমার—এগুলো ভারতের কবল থেকে ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মানচিত্র পূর্ণতা পাবে না।”
ফাহিম নির্যর নামে একজন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে লেখেন,
“এটা চিরন্তন সত্য—সেদিন বিজয় হয়েছিল ভারতেরও। দুই পাকিস্তানকে আলাদা করার যে স্বপ্ন তারা দেখেছিল, তা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাস্তবায়িত হয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক আবারও স্পষ্ট করেছে যে ১৯৭১ সালের ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। বাংলাদেশের কাছে ১৬ ডিসেম্বর মূলত একটি জাতির আত্মত্যাগ, মুক্তি ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক—যেখানে বিজয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাঙালি জনগণের রক্ত ও সংগ্রাম।