অনলাইন জনমত কতটুকু বাস্তবসম্মত নাকি এজেন্ডাভিত্তিক
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অনিশ্চিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নির্বাচন ও জনমত নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গণমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম একের পর এক জরিপ প্রকাশ করছে—যার বেশিরভাগই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই অনলাইন অ্যাক্টিভিটিভিত্তিক জরিপ কতটা বাস্তবসম্মত, আর কতটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব বা এজেন্ডা—তা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। প্রতিনিধিত্ব সংকট, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে এসব জরিপ বাংলাদেশে প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন কি আদৌ ঘটাতে পারে—এখন সেটাই মূল আলোচনার বিষয়।
অনলাইন জনমত কতটুকু বাস্তবসম্মত নাকি এজেন্ডাভিত্তিক
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তীতে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটছে না। গণমাধ্যমগুলো নির্বাচন, বর্তমান সরকার, দলীয় জনপ্রিয়তা নিয়ে বিভিন্নভাবে জরিপ করছে, যা মূলত অনলাইন অ্যাক্টিভিটির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা কতটা বাস্ততা-নির্ভর, নাকি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার এজেন্ডাভিত্তিক কার্যক্রম—তা বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনভিত্তিক এসব জরিপ নির্বাচন-পরবর্তী ফলাফল যাচাইয়ে কতটা সঠিকতা প্রদান করতে পারবে, সেটি বোঝা জরুরি।
অনলাইন জরিপের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কিছু বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়—মোট জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ, ভোটদাতার বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান, ভোটের বিষয়ের স্পষ্টতা, অংশগ্রহণকারীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা এবং জরিপকারীর সৎ উদ্দেশ্য।
বর্তমান বাংলাদেশের নির্বাচনী জরিপ বা সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে নেওয়া অনলাইন জরিপ পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসব জরিপ মূলত ফেসবুকনির্ভর। দেশে প্রায় ৮ কোটির কাছাকাছি ফেসবুক একাউন্ট থাকলেও তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই ভোটার নয়; আবার একই ব্যক্তির একাধিক একাউন্ট থাকে। যারা ভোটার, তারাও এসব জরিপে অংশ নিতে অনাগ্রহী। ব্যবসায়ী, প্রবীণ রাজনীতিবিদ, উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ডাক্তার-প্রকৌশলী বা প্রথম শ্রেণির নাগরিকেরা সাধারণত এসব জরিপে অংশ নেন না।
যে সব পোর্টাল, মিডিয়া বা সংস্থা জরিপ চালায়, তাদের জরিপে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুবই কম। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সাধারণত মফস্বলের মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্তরা জরিপে অংশ নেওয়ার মতো সুযোগ বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা রাখেন না।
মিডিয়া বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম আলোর ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের এক জরিপে “আগামী নির্বাচনে কে জিততে পারে” প্রশ্নে ১ লাখ ৬৫ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী রিয়্যাক্ট দিয়েছে এবং প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ মন্তব্য করেছে। অথচ বাংলাদেশের একটি নির্বাচনী আসনেই গড়ে ৩.৫ লাখ ভোটার থাকে। ফেসবুক ছাড়া বর্তমানে নির্বাচন অনুষ্ঠান ব্যতীত অন্য কোনো কার্যকর জরিপপদ্ধতি বাংলাদেশে নেই।
তাছাড়াও বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশাল পরিসরে জরিপ করেও সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন। কারণ, আওয়ামী লীগের বড় অংশের সমর্থকরা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে হয়তো ভোট বর্জন করবে, নতুবা এমন প্রার্থীকে সমর্থন দেবে যা প্রকাশ্যে জানাবে না—অথবা দলীয় স্বার্থে ভিন্ন আচরণ করবে।
সেক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মসহ যে কোনো পদ্ধতির জনমত জরিপ যেমন অবাস্তব, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে প্রপাগান্ডামূলকও। বাংলাদেশে বিভিন্ন মিডিয়া যে জরিপ প্রকাশ করে তার কোনো স্ট্যান্ডার্ড মানদণ্ড নেই। অনেক এজেন্সি ও মিডিয়া নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়ন, সরকারপন্থী প্রচারণা, নিয়মিত অ্যাক্টিভিটি বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের লক্ষ্যেও এমন জরিপ পরিচালনা করে। এর ফলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে এবং গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের পক্ষপাতমূলক অনাস্থা বাড়ছে।
লেখক: এস গোস্বামী