আসাদুজ্জামান কামালকেও ফেরত দিবে না ভারত
প্রেস সচিব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করলেও বাস্তবতা, কূটনৈতিক চাপ, মানবাধিকার শর্ত, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং চুক্তির নানা ধারা বলছে। ভারত খুব সহজে বা দ্রুত আসাদুজ্জামান খান কামালকে বাংলাদেশে ফেরত দেবে না। বরং বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক আলোচনায় গড়াতে পারে।
আসাদুজ্জামান কামালকেও ফেরত দিবে না ভারত
মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ভারত খুব শিগগিরই বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করবে—এমন দাবি করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, “জেনে বুঝেই” এ তথ্য তিনি দিয়েছেন এবং পররাষ্ট্র উপদেষ্টা কিছু না জানলেও সাবেক মন্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার হবে।
তবে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নানা মহলে। কারণ ২০১৩ সালের বাংলাদেশ–ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও এই চুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বহু আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা রয়েছে। আর সেসব জটিলতার কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন—ভারত আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
স্ট্যাটাস থেকে প্রেস ব্রিফিং—বিতর্কের শুরু
গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাসে প্রেস সচিব দাবি করেন, ভারত নাকি কামালকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে। কিন্তু পরে এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, এ বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো “লিখিত বা আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই।”
এতে প্রশ্ন ওঠে—প্রেস সচিবের বক্তব্য কি শুধু রাজনৈতিক বার্তা, নাকি গোপনে কোনো আলোচনা চলছে?
শফিকুল আলম অবশ্য তার অবস্থান বজায় রেখে বলেন,
“আমি জানি বলেই বলেছি। ১৫ বছরে গুম-খুনের হোতা হিসেবে দেশকে অন্ধকারে নিয়ে গেছেন কামাল।”
কেন ভারত সম্ভবত প্রত্যর্পণ করবে না — বাস্তব বিশ্লেষণ
প্রেস সচিবের দাবি থাকলেও বাস্তবতা বলছে, ভারত কামালকে ফেরত দেবে এমন নিশ্চয়তা নেই। এর কয়েকটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে:
১. রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের দীর্ঘ ঐতিহ্য
ভারত বহু বছর ধরে প্রতিবেশী দেশের ক্ষমতাচ্যুত বা বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে।
এক্ষেত্রে ভারত সাধারণত কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক লাভ–লোকসান বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়।
আসাদুজ্জামান খান কামাল বাংলাদেশে একসময় ক্ষমতাশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাকে ফিরিয়ে দিলে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবও প্রভাবিত হতে পারে—বিশেষত সীমান্ত রাজ্যগুলোর কাছে।
২. মৃত্যুদণ্ডের মামলায় প্রত্যর্পণ সাধারণত কঠিন
অনেক দেশ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে প্রত্যর্পণ করে না।
ভারতের সাথে চুক্তি থাকলেও ‘মৃত্যুদণ্ড’ একটি বড় বাধা—কারণ ভারত প্রায়ই দাবি করে, প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে মানবাধিকার মানদণ্ড বিবেচনাযোগ্য।
৩. কামালের বিরুদ্ধে অভিযোগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিনা—ভারত বিচার করতে চাইবে
ভারত সাধারণত চায় না যে তাদের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে পারে।
তারা অভিযোগের প্রকৃতি, মামলার বিশ্বস্ততা, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে।
এই কারণে ভারতের অনুমোদন পাওয়া সহজ নয়।
৪. প্রত্যর্পণ চুক্তির ‘বাধ্যতামূলক নয়’ ধারা
২০১৩ সালের চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা আছে—
দুই দেশই ‘জাতীয় স্বার্থ’ বিবেচনায় যে কোনো অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারবে।
এই ধারা ভারতের হাতে বড় ছাড়পত্র দেয়।
৫. ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিবেচনা:
বাংলাদেশের রাজনীতির বড় পক্ষগুলো নিয়ে ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা ও কৌশলগত হিসাব রয়েছে।
হাই-প্রোফাইল কোনো রাজনীতিবিদকে ফেরত দিলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এক ধাক্কায় বদলে যেতে পারে—ভারত এমন ঝুঁকি নিতে চায় না।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন,
“চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী কামালকে ফেরানোর সুযোগ আছে। কিন্তু ভারত সেটা বাস্তবে করবে কি না—সেটাই বড় প্রশ্ন। তবে শেখ হাসিনাকে ফেরানো যেভাবে কঠিন, কামালের ক্ষেত্রেও বাস্তবে একই রকম কূটনৈতিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।”