মৌলবাদী শক্তির উত্থান ভারতেরও বিপদ’, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে বাড়ছে উদ্বেগ
ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ আবেদন: ‘কোনও প্রত্যর্পণ চুক্তি ঘাতকের হাতে তুলে দিতে বলে না’ — বিশেষজ্ঞ অঞ্জন বেরা
মৌলবাদী শক্তির উত্থান ভারতেরও বিপদ’, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাকে ভারতে থেকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার আনুষ্ঠানিক আবেদন স্বীকার করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ শুধু একটি আইনি বা কূটনৈতিক প্রশ্ন নয়—বরং বাংলাদেশে গণতন্ত্র, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা– এগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি—পটভূমি
মনমোহন সিংহের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের আমলে ২০১৩ সালে ভারত–বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি সই হয়।
চুক্তি অনুযায়ী—
আদালতের রায়ে প্রমাণিত অপরাধীকে এক দেশ অন্য দেশের হাতে তুলে দিতে পারবে।
সন্ত্রাস, অপরাধ, দুর্নীতি ইত্যাদি যেসব অপরাধ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গুরুতর বলে ধরা হয়, সেসব ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণের পথ আরও সহজ হয়।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালে চুক্তিতে সংশোধন করা হয়। সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী—
শুধুমাত্র গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেই প্রত্যর্পণ করা সম্ভব,
দীর্ঘ তথ্যপ্রমাণ বা অতিরিক্ত নথির আর প্রয়োজন পড়ে না।
এই সংশোধিত চুক্তির ভিত্তিতেই বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের আবেদন পাঠিয়েছে।
‘চুক্তি ঘাতকের হাতে তুলে দিতে বলে না’ — অঞ্জন বেরা
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অঞ্জন বেরা মন্তব্য করেন—
“কোনও প্রত্যর্পণ চুক্তিই বলে না যে কাউকে এমন কারোর হাতে তুলে দাও, যে তাকে হত্যা করতে পারে বা রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেবে। ঘাতকের হাতে কাউকে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গেও যায় না।”
তিনি আরও জানান—
“বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তি বর্তমানে যেভাবে উত্থান ঘটাচ্ছে, তা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়—ভারতের জন্যও তা হুমকি। এই প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়টিকে শুধু রাজনৈতিক বা আইনি দৃষ্টিতে দেখা ভুল হবে।”
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভারতের উদ্বেগ
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা, রাজনৈতিক পরিবর্তন, এবং অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই ঢাকার পক্ষ থেকে দিল্লিকে প্রত্যর্পণ অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ভারত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি, তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে বাংলাদেশের অনুরোধ পেয়েছে ভারত এবং বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদল,
মৌলবাদী ও উগ্র গোষ্ঠীর পুনরুত্থান,
সীমান্ত নিরাপত্তা,
এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীলতা—
এসবই ভারতের বিবেচনায় আসবে।
‘গণতন্ত্রে ঘাটতি ছিল’ — তবে হত্যার ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না
অধ্যাপক বেরা বলেন—
“গণতন্ত্রে যা করার ছিল, সেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘাটতি ছিল—এটা সত্যি। কিন্তু তাঁকে যাদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্টতই প্রতিহিংসাপরায়ণ। কোনও সভ্য রাষ্ট্রই এমন সিদ্ধান্ত সহজে নেবে না।”
তিনি আরও বলেন—
“ভারত যদি এমন পরিস্থিতিতে কাউকে ফেরত পাঠায়—এটি আন্তর্জাতিকভাবেও সমালোচনার মুখে পড়বে। কারণ প্রত্যর্পণের নীতি মানবাধিকার রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়।”
কূটনৈতিক চাপ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ
এই বিষয়ে ভারত কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেই দিকে এখন দক্ষিণ এশিয়ার নজর। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যেমন টালমাটাল, তেমনি ভারতের পক্ষে এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে—
যদি ভারত প্রত্যর্পণ না করে, বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিতে পারে।
আর যদি প্রত্যর্পণ করে, তবে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগে আন্তর্জাতিক মহল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।