পে-স্কেল ঘিরে অসন্তোষ, জুলাই আন্দোলন: নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতার বিস্তার
বাংলাদেশে পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে যাওয়া ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন একদিনে জন্ম নেয়নি। দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য, স্বায়ত্বশাসিত খাতের পেনশন-বঞ্চনা, এবং প্রত্যয় স্কেলকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ভুল বোঝাবুঝির সুযোগে ধীরে ধীরে জমাট বাঁধে এক বহুমাত্রিক অস্থিরতা। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তকে ঘিরে প্রথমে যে সীমিত অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, তা দ্রুতই রূপ নেয় সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতিবাদের মঞ্চে—যেখানে আন্দোলনের দাবির চেয়ে প্রভাব ছিল ক্ষমতার সমীকরণে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ছাত্রসংগঠন, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এবং মৌলবাদী জিহাদী গোষ্ঠীগুলোর অদৃশ্য সমন্বয়ে আন্দোলন পায় এক ভিন্ন মোড়। দেশি-বিদেশি প্রভাব, সোশ্যাল মিডিয়ার আগুনে ঘি ঢালা প্রচারণা এবং ভুল তথ্যভিত্তিক গণউত্তেজনার জোয়ারে এই আন্দোলন ধীরে ধীরে শুধু প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং রাষ্ট্র কাঠামোকে নড়বড়ে করে তোলার এক বৃহৎ অপারেশনে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীতে যা ‘গণআন্দোলন’ নয়, বরং সরকারের বিরুদ্ধে সংগঠিত একটি কৌশলগত মাস্টারপ্লানের চেহারা স্পষ্ট করেছে।
পে-স্কেল ঘিরে অসন্তোষ, জুলাই আন্দোলন: নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতার বিস্তার
বিগত সরকারের প্রস্তাবিত একটি স্কেল ও জুলাই আন্দোলনের সূচনা:
আওয়ামীলীগ সরকার দীর্ঘ আলেচনার পর স্বায়ত্বশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ ও স্বজাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য প্রত্যয় স্কেল চালু করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। যেটা তারা আগষ্ট ০১ তারিখ থেকে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রত্যয় বিশ্লেষনে দেখা যায় এটা সকল শ্রেনীর পেশাজীবি মানুষের জন্য কল্যানকর ও তাদের দীর্ঘমেয়াদে পরিবারের র্আথিক আস্তাশীলতা তৈরিতে কার্যকরী। যেখানে এ স্কেলের আওয়াতাধীন সকল প্রতিষ্ঠান তার কর্মকর্তা কর্মাচারীকে পেনশন দিতে বাধ্য এবং তার পরিবারও তার মৃত্যুর পর আর্থিক সুবিধা পাবে।
এ বিষয়ে সকল পেশার মানুষের কোন আপত্তি ছিল না কারন যারা বিষয়টি বুঝতে পেরেছিল তারা সন্তুষ্ট ছিল আর যারা এ বিষয়ে বোঝার যথেষ্ট আগ্রহ ছিল না তারা তাদের শেষ জীবনের আর্থিক নিশ্চয়তা পাবে এজন্য সম্মতি ছিল। কারন এদেশের বৃহৎ যে স্বায়ত্বশাসিত, স্বশাষিত খাত ছিল তার ৭০% পেশাজীবিরা পেনশন ও প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। তবে এ বিষয়ে বাধা হয়ে দাড়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেহেতু তাদের বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থায় বেতন থেকে টাকা কর্তন করা হত না এবং প্রত্যয় স্কিম চালু হলে টাকা কর্তন করা হবে সেজন্য। তারা এককালীন আনুতোষিকও পাবেন না। অথচ এ স্কিমে তারা যে পেনশন পাবে তা পূর্বের চেয়ে তিনগুন। এক্ষেত্রে সরকারের নীতি নির্ধারক পর্যায় থেকে তাদের বোঝাতে সক্ষম হয় নি তাছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অতিমাত্রায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। তারা ০১ জুলাই, ২০২৪ এ সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সর্বাত্বক ক্লাস বর্জন ও কর্মবিরতি ঘোষনা করে।
সে সময়ে ২য় বার জুন,২০২৪ এর ৬ তারিখ থেকে কোটা সংস্কারের আন্দোলনে বিভিন্ন ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছিল। শিক্ষকরাও তাদের কর্মবিরতির মাধ্যমে তাদের আন্দোলন বেগবান করতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও যোগ দেওয়া শুরু করে এবং বিভিন্নভাবে সরকার বিরোধী স্লোগানে তাদের উদ্বুদ্ধ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগীয় সোস্যাল সংগঠন থেকে শুরু করে ছোট ছোট সাধারন শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোকেও উৎসাহিত করে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে ওঠে রাজনৈতিক চর্চার মূল কেন্দ্রবিন্দু। বাম সংগঠন থেকে শুরু করে সরকারবিরোধী বিভিন্ন মৌলবাদী ছাত্রসংগঠন গুলো সেমিনারের মাধ্যমে সরকারবিরোধী সমালোচনা ও বৈষম্যের ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারন শিক্ষার্থীদেরও তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিনত করে।
সরকার প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সাথে রাস্তায় নেমে গুজবের উপর ভর করে বিভিন্ন তথ্যের বর্ননা দিয়ে বক্তব্য দিতে থাকে। তখনকার সময়ে সরকারের কঠোরতার সমালোচনা করতে গিয়ে যতটা না সত্য তার চেয়ে অধিক বিভ্রান্তিমূলক ভায়োলেন্স বক্তব্য দিয়ে সারা বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহবান জানায়।
এভাবে প্রতিটি ক্যাম্পাসে সরকার বিরোধী আন্দোলন জোরদার হতে থাকে প্রবলভাবে। সরকার দাবীগুলো মেনে নিলেও বিভিন্ন অযুহাতে সরকারকে বয়কটের ডাক দেয়া হয়। সরকার আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে শিক্ষকরা ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী হত্যা ও দমনের প্রপাগন্ডামূলক বক্তব্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের সোস্যাল মিডিয়া থেকে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেহেতু একটি দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নাগরিক সেহেতু তাদের সাথে দেশি বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা, মানবাধিকার কমিশন, রাজনৈতিক বিরোধীদলগুলোর সাথে যোগাযোগ ছিল নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের। তারা আন্দোলনের ফান্ড থেকে শুরু করে সরকার বিরোধী সমালোচনায় মিডিয়াগুলোতে সরব হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষকরা ও সংগঠনগুলো সরকারবিরোধী বা ভিন্নমতের রাজনৈতিক আদর্শের ছিল তারা আন্দোলনের সম্মুখেভাগে অবস্থান নেয়। রাজনৈতিক বিরোধী শক্তিগুলো বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষকে জড় করতে শুরু করতে শুরু করে। অন্যদিকে মৌলবাদী, জিহাদী, ধর্মীয় সংগঠনগুলো আইএস দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভারতবিরোধী স্লোগান ও কর্মসূচি দিতে শুরু করে। তারা দেশের ধর্মভীরু নীরিহ মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে দাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ইসলামিক বায়াত দিতে থাকে। কারাগারে আবদ্ধ জঙ্গীরা তাদের কারাবন্দীদের আহবান করে সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদের। হলি আর্টিজেনের ঘটনায় জড়িত হিযবুত তাহেরি, আনসার আল ইসলাম, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম সহ বিভিন্ন জঙ্গীসংগঠন ইসলামিক দলগুলোর সাথে সম্মিলিত ভাবে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় সরকারের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে থাকে।
ঢাকা শহরসহ জেলা শহরগুলোতে যখন আন্দোলনকারীদের দ্বারা সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হামলা ভাংচুরের স্বীকার হচ্ছে তখন সরকার জানমাল নিরাপত্তায় বিধানে তা প্রতিহত করা শুরু করে। দেশের ভিতরে ও বাইরে যারা সোস্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্ছার তারা সরকারের পুলিশের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করে বিভিন্ন অপতথ্য দিয়ে দেশের মানুষকে আরও উস্কানী দিয়ে উগ্র করে ফেলে। প্রতিটি থানায় হামলা হয় পুলিশদের হত্যা করা হয় নৃশংসভাবে। এসব ঘটনায় মিডিয়া ও সোস্যাল মিডিয়ায় জনরোষ হিসেবে উপস্থাপন করলেও এসবের নেপথ্যে ছিল রাজনৈতিক বিরোধীশক্তি ও জঙ্গী জিহাদী সংগঠনগুলো।
একসময় একদফা দাবির জোর আন্দোলনে আওয়ামিলীগ সরকার বিতাড়িত হয়। অভূত্থান পরবর্তীতে বাংলাদেশের যে চিত্র দেখা যায় এটা আসলে গন আন্দোলন ছিল না এটা ছিল একটা সরকারকে উৎখাতের মাস্টারপ্লান যা সে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা অপশক্তির উত্থান।
এস গোস্বামী