বন্ধুত্ব, ইতিহাস ও নিরাপত্তা—এই তিন কারণেই ভারতে নিরাপদ শেখ হাসিনা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ চেয়েছে। কিন্তু দিল্লির রাজনৈতিক ইতিহাস, কৌশলগত স্বার্থ এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে ভারত এখনই এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকারই শেখ হাসিনাকে আপাতত নিরাপদ রাখছে। লেখক: দ্য ডিপ্লোম্যাটের দক্ষিণ এশিয়া সম্পাদক

PostImage

বন্ধুত্ব, ইতিহাস ও নিরাপত্তা—এই তিন কারণেই ভারতে নিরাপদ শেখ হাসিনা


বাংলাদেশ সরকারের নোট ভারবাল ও প্রত্যর্পণ দাবি

বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে নোট ভারবাল (আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বার্তা) পাঠিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) গত ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাঁচ দিন পর এ কূটনৈতিক বার্তা পাঠানো হয়।

অভিযোগ—গত বছরের জুলাই–আগস্টের শিক্ষার্থী আন্দোলন দমনে নির্দেশনা দিয়ে তারা প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। রায় ঘোষণার পরই অন্তর্বর্তী সরকার দিল্লিকে দ্রুত দুজনকে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশের সঙ্গে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী এটি ভারতের ‘বাধ্যতামূলক দায়িত্ব’। সেই সঙ্গে সতর্ক করে যে, মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া হলে তা হবে ‘অমিত্রসুলভ আচরণ’ ও ন্যায়বিচারের প্রতি আঘাত।


ভারতে আশ্রয়, বিবৃতি ও দীর্ঘ নীরবতা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। সেখান থেকেই তিনি বিবৃতি ও সাক্ষাৎকার দিয়ে যাচ্ছেন। গত এক বছরে বাংলাদেশ একাধিকবার তার প্রত্যর্পণ দাবি তুললেও দিল্লি তাতে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

প্রথম নোট ভারবালের জবাবে ভারত শুধুই ‘গ্রহণের বিষয়টি’ নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় অনুরোধেরও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সাড়া দেয়নি। আইসিটির রায়ের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুধু জানিয়েছিল তারা ‘রায় লক্ষ্য করেছে’। তবে প্রত্যর্পণের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছে।


দিল্লির সতর্ক অপেক্ষা — কেন এখনই পদক্ষেপ নেবে না ভারত

ভারতের দক্ষিণ এশিয়া গবেষক স্মৃতি এস. পট্টনায়ক বলেন, বাংলাদেশে বর্তমান সরকার ‘অস্থায়ী ও সীমিত ম্যান্ডেট’ নিয়ে চলছে। তাই ভারত একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে।

ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখে।
এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ:

  1. বন্ধুত্ব ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক — মুক্তিযুদ্ধের সময় সহযোগিতা ও ১৯৭৫ সালের পর আশ্রয় দেওয়া।

  2. নিরাপত্তা সহযোগিতা — ভারতের উত্তর–পূর্বে বিচ্ছিন্নতাবিরোধী অভিযানগুলোতে শেখ হাসিনার ভূমিকা।

  3. দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ — তার শাসনামলে ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারও সুরক্ষিত ছিল।

এই বাস্তবতায় দিল্লির কাছে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে পাঠানো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।


প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও জটিলতার সম্ভাবনা

২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারত চাইলে বাংলাদেশে অপরাধী ফেরত পাঠাতে পারে। তবে এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা রয়েছে—
‘রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধ’ হলে প্রত্যর্পণে অস্বীকৃতির সুযোগ।

ভারত বলতে পারে:

  • অভিযোগের সরাসরি সম্পৃক্ততা ‘প্রমাণ করা কঠিন’।

  • বিচারপ্রক্রিয়া ‘ন্যায়সংগত হয়নি’।

  • ট্রাইব্যুনালের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এমনকি ভারত চাইলে ইতিবাচক সাড়াও দিতে পারে, কিন্তু তারপর আদালতে পূর্ণাঙ্গ শুনানি হবে—যেখানে শেখ হাসিনা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি, জটিল এবং সময়সাপেক্ষ।


২০২৬ সালের নির্বাচন সামনে — কেন ভারত অত্যন্ত সতর্ক

বাংলাদেশ ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদার।
বিদেশনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে দিল্লি এখন “সতর্ক, নীরব ও পর্যবেক্ষণধর্মী”— এই অবস্থানেই থাকবে।

এর কারণ:

  • নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী বক্তব্য বাড়তে পারে।

  • প্রত্যর্পণ ইস্যুতে যে কোনো একতরফা পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ককে উত্তেজিত করতে পারে।

  • দিল্লি চায় সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে।


বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান নিলেও দিল্লির কাছে শেখ হাসিনা এখনো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
বন্ধুত্ব, ঐতিহাসিক সম্পর্ক, কৌশলগত নিরাপত্তা ও ভারতের আঞ্চলিক স্বার্থ—সব মিলিয়ে ভারত নিকট ভবিষ্যতে তার প্রত্যর্পণ বিষয়ে কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে না।

লেখক: দ্য ডিপ্লোম্যাটের দক্ষিণ এশিয়া সম্পাদক