বাংলাদেশের চিঠি পৌঁছেছে দিল্লিতে: শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে ভারত বাধ্য নয়—বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট মত

বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠালেও নয়াদিল্লি এ বিষয়ে বাধ্য নয় বলে মত দিয়েছে ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা। তাদের দাবি, বাংলাদেশ–ভারত বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তিতে এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যার ভিত্তিতে প্রাণঝুঁকি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অথবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা দেখা দিলে ভারত আইনগতভাবেই প্রত্যর্পণ না-করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

PostImage

বাংলাদেশের চিঠি পৌঁছেছে দিল্লিতে: শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে ভারত বাধ্য নয়—বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট মত


বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান জানিয়ে’ ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস)-এর প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনিরুজ্জামান। ২২শে নভেম্বর ঢাকায় ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের এক অধিবেশনে তিনি বলেন, বাংলাদেশ-ভারত বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে ভারত প্রায় বাধ্য শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে।

তার এই বক্তব্য দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তোলে। নেটিজেনদের প্রশ্ন—চুক্তি কি সত্যিই ভারতের ওপর এমন বাধ্যবাধকতা তৈরি করে?

কিন্তু ভারতের বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন—ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে বাধ্য নয়

চুক্তির শর্তই নির্ধারণ করছে ভারতের অবস্থান

আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া মন্তব্যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক অনিন্দ্যজ্যোতি মজুমদার বলেন—
“চুক্তি থাকলেও সেখানে এমন শর্ত রয়েছে, যার কারণে ভারত আইনগতভাবে বাধ্য নয় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে।”

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ইমনকল্যাণ লাহিড়ীর বক্তব্যও একই সুরে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক চরিত্রের মামলা, ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ, অথবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি দেখালে ভারত কারও প্রত্যর্পণ নাও করতে পারে।

রায়ের পর প্রাণঝুঁকি—চুক্তির বড় বাধা

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী জানান,
“১৭ই নভেম্বরের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর বাংলাদেশে শেখ হাসিনার প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। এই কারণেই ভারত তাকে ফেরত দিতে বাধ্য নয়।”

তিনি চুক্তির সেই ধারা তুলে ধরেন যেখানে বলা আছে—
➡️ যদি কোনো দেশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জীবনের ঝুঁকি থাকে, প্রত্যর্পণ করা যাবে না।

মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারের দৃষ্টিকোণ

কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী অরিন্দম দাস বলেন—

“দেশে না-থাকার কারণে যদি শেখ হাসিনা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে না পারেন, তবে তা তার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। ভারত এই বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে পারে।”

তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী প্রাণঘাতী পরিস্থিতির আশঙ্কা থাকলে কোনো দেশ অভিযুক্তকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য নয়।

চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ধারা: রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলে প্রত্যর্পণ নয়

বাংলাদেশ–ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তিতে পরিষ্কার লেখা আছে—

  • অপরাধের রাজনৈতিক চরিত্র থাকলে প্রত্যর্পণ করা যাবে না।

  • বিচার প্রক্রিয়ার নেপথ্যে যদি সৎ উদ্দেশ্য না থাকে, তবে প্রত্যর্পণ করা যাবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনা বারবারই দাবি করেছেন যে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অন্যায় বিচার চলছে। ভারত চাইলে এই যুক্তিগুলো বিবেচনায় নিতে পারে।


বাংলাদেশের চিঠি দিল্লিতে পৌঁছেছে

২৩শে নভেম্বর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।

বাংলাদেশ মিশন থেকে গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই চিঠি পাঠানো হয়—এটি শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক অনুরোধ

গত বছরের জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ১৭ই নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সেই রায়ের পর থেকেই ভারত থেকে তাদের প্রত্যর্পণ প্রশ্নে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে।