সিরাজপন্থী বামদের ন্যারেটিভে আটকে জামায়াত–বিএনপি
বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে এক অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—জামায়াত–বিএনপি ধীরে ধীরে আটকে পড়ছে ১৯৭১–পরবর্তী উগ্র বাম ন্যারেটিভের পুনরুত্থিত ছকেতে। রাজনৈতিক মতাদর্শে দু’পক্ষ যতই ভিন্ন হোক, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সহিংসতা, ভারতবিরোধী উত্তেজনা, রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা ও ডিজিটাল প্রোপাগান্ডায় তাদের আচরণে সিরাজপন্থী বাম রাজনীতির পুরোনো কৌশলের ছাপ ক্রমেই দৃশ্যমান। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পিনাকি ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন বাম-ধাঁচের ন্যারেটিভ বিএনপি–জামায়াতের উল্লেখযোগ্য অংশকে প্রভাবিত করে এমন এক রাজনৈতিক মানসিকতায় ঠেলে দিয়েছে, যার নিয়ন্ত্রণ দলের ভেতরে নয়, বরং বহিরাগত মতাদর্শিক গোষ্ঠীর হাতে। এ কারণে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান—সবই নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
সিরাজপন্থী বামদের ন্যারেটিভে আটকে জামায়াত–বিএনপি
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। তা হলো,১৯৭১ পরবর্তী উগ্র বাম রাজনীতির পুরোনো ন্যারেটিভ নতুন আকারে ফিরে এসে জামায়াত–বিএনপির রাজনৈতিক আচরণকে প্রভাবিত করছে। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে দুই শক্তি সম্পূর্ণ বিপরীত মতাদর্শের হলেও, ন্যারেটিভ এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার মুহূর্তে তারা এক অদ্ভুত সংযোগে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
স্বাধীনতার পরপরই সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে সর্বহারা পার্টি বাংলাদেশে বৈপ্লবিক সহিংসতাকে রাজনৈতিক কর্মকৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিল। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে ধারাবাহিকভাবে থানা, পুলিশ ফাঁড়ি, ব্যাংক, রেললাইন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের আক্রমণ রাষ্ট্রকে প্রায় অচল করে দিয়েছিল। তারা ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয়ের দিন হিসেবে নয়, বরং ‘ভারতীয় সামরিক দখলের কালো দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে হরতাল,বিস্ফোরণ,সহিংসতার পথ নেয়। রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামোর পরোয়া না করে সিরাজ সিকদার নিজেই সংগঠনের ভেতরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতেন, যা স্বাধীন দেশের আইন ও গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছিল। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর অনুসারীরা এটি “রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র” হিসেবে ব্যাখ্যা করে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বয়ান গড়ে তোলে।
এই বয়ানই বহু দশক পরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে একটি নতুন রূপ নেয়। সিরাজপন্থী বাম রাজনীতির কিছু অংশ সহিংসতার জায়গা থেকে সরে গিয়ে ন্যারেটিভ–যুদ্ধকে কৌশল হিসেবে বেছে নেয়। অনলাইন প্রোপাগান্ডায় ভারতবিদ্বেষ, বঙ্গবন্ধুবিরোধী অভিযোগ, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা ক্রমেই দৃশ্যমান হয়। এর কেন্দ্রীয় একটি চরিত্র হয়ে ওঠেন পিনাকি ভট্টাচার্য, যিনি অতীতে বামমুখী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সময়ের সঙ্গে নিজেকে এমনভাবে রূপান্তরিত করেন যে মুসলিম পরিচয়–নির্ভর জনসমর্থন তাকে “ডিজিটাল নেতৃত্ব” হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে।
গণজাগরণ মঞ্চের সময় রাজাকারবিরোধী ন্যারেটিভ নির্মাণে সক্রিয় থাকা বাম বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে ঠিক উল্টো অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়। তারা বুঝতে পারে, রাজনৈতিকভাবে ক্ষুব্ধ ও আবেগচালিত ইসলামপন্থী জনশক্তিকে ন্যারেটিভ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলক সহজ। এই কৌশল কাজে লাগিয়ে পিনাকি ও তাঁর অনুসারীরা ভারতবিরোধী আবেগ, বিচারের ক্ষোভ এবং সরকারবিরোধী প্রচারের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল আন্দোলন সৃষ্টি করে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে বিএনপি–জামায়াতের সমর্থকগোষ্ঠীর ওপর।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতায় এই প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়। বিএনপি–জামায়াতের একটি বড় অংশ হঠাৎই এমন সব আচরণে লিপ্ত হয়। যেমন,রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলার আহ্বান,রাজনৈতিক নেতার বাড়িতে আক্রমণের নির্দেশনা, ভারতবিরোধী তীব্র উস্কানি,যা '৭০ এর দশকের সিরাজপন্থী উগ্র বাম রাজনীতির পুরোনো কৌশলের সঙ্গে আশ্চর্যসদৃশ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কর্মীরা উত্তেজনার উৎস খুঁজে নেয় অনলাইনের এই “ভার্চুয়াল নেতাদের” বক্তব্যে, যাদের সঙ্গে সংগঠনগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই।
এখানেই বিএনপি–জামায়াতের প্রধান দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা জনবল ও সংগঠনগত ভিত্তিতে শক্তিশালী হলেও ন্যারেটিভ যুদ্ধে খুব দুর্বল। বিপরীতে, সিরাজপন্থী বাম রাজনৈতিক বাস্তবে বহু ছোট হলেও, তারা ন্যারেটিভ গঠনে দক্ষ এবং কৌশলে পরিপক্ব। এই অসম সামঞ্জস্যের কারণে বিএনপি–জামায়াত ধীরে ধীরে এমন একটি বয়ানে আটকে পড়ে, যার নিয়ন্ত্রণ আসলে অন্য কারও হাতে।
ফলাফল আরও দূরবর্তী। বাংলাদেশের ওপর আন্তর্জাতিক মহলে “ইসলামিক এক্সট্রিমিজম–ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র” হিসেবে যে ধারণা তৈরি হচ্ছে, তার পেছনে অনেক সময়েই দেখা যায় দুই বিপরীতমুখী শক্তি উগ্র বাম এবং আবেগনির্ভর ডানপন্থী গোষ্ঠী নিজ নিজ উদ্দেশ্যে একই চিত্র তৈরি করছে। এই প্রচারণা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হলেও রাজনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে সেইসব গোষ্ঠী, যারা দেশকে ক্রমাগত সংকটাপন্ন হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়।
সবশেষে বলা যায়,বাংলাদেশের রাজনীতি আজ আর কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি ন্যারেটিভ–যুদ্ধ। যে পক্ষ ন্যারেটিভ হারায়, তারা রাজনীতি হারায়; আর যে পক্ষ ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ করে, তারা জনমনে প্রভাব বিস্তার করে। ২০২৪ এর সহিংসতার দায় বিএনপি–জামায়াতের ওপর যত গভীর হবে, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তত সংকটে পড়বে। অপরদিকে, উগ্র বাম ন্যারেটিভ আবারও শক্তি সঞ্চয় করছে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের প্রভাব ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
তবে ইতিহাস বারবার এক বাস্তবতাই দেখিয়েছে—যখন বিভ্রান্তি দীর্ঘায়িত হয়, তখনই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক চেতনা নতুনভাবে ফিরে আসে। বাংলাদেশের রাজনীতিও শেষ পর্যন্ত সেই পুনরাবৃত্তির অপেক্ষায়।
এস. গোস্বামী:
রাজনৈতিক বিশ্লেষক