ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিল, কঠোর হচ্ছে অভিবাসননীতি
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিলের দাবি ঘিরে উদ্বেগ, কঠোর যাচাইয়ের মুখে বিদেশি শিক্ষার্থী, কর্মী ও ভ্রমণকারীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিদেশি নাগরিকদের তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিল করেছে দেশটির সরকার। মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে এ পর্যন্ত বাতিল হওয়া ভিসার সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এ হিসাব দেশটির অভিবাসন ও ভিসানীতিতে কঠোরতা বৃদ্ধির নতুন চিত্র তুলে ধরেছে। রয়টার্স ও আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে জানান, ট্রাম্প প্রশাসন আগের যেকোনো প্রশাসনের তুলনায় দ্রুতগতিতে ভিসা বাতিল করেছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব বিদেশি নাগরিক ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করেছেন, অপরাধে জড়িয়েছেন, প্রতারণা করেছেন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিলের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, জাতীয়তাভিত্তিক বিভাজন এবং প্রতিটি ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে আগের সরকারি ঘোষণাগুলো তুলনা করলে বাতিলের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ২০২৫ সালে এক লাখের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছিল। পরে ১০ আগস্ট প্রকাশিত সরকারি তথ্যে জানানো হয়, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বাতিল ভিসার সংখ্যা এক লাখ পঁচাত্তর হাজার ছাড়িয়েছে। অক্টোবরের নতুন ঘোষণায় সেই সংখ্যা তিন লাখের বেশি বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ আগস্টের ঘোষণার পরও ভিসা বাতিলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রশাসন বলছে, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের ভিসা বাতিলের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারি বক্তব্যে হামলা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, যৌন নিপীড়ন, শিশু নির্যাতন, আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতির মতো ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ভিসার শর্ত ভঙ্গ, অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহার এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগকেও ব্যবস্থা নেওয়ার কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের ২০ অক্টোবর প্রকাশিত বিবরণে বলা হয়েছে, বাতিল হওয়া ভিসার মধ্যে অন্তত চার হাজার এমন ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যাঁদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণসংক্রান্ত বিধি অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অপরাধে জড়িত বা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীদের ছয় হাজারের বেশি ভিসা বাতিলের কথাও উল্লেখ করেছে প্রশাসন। তবে এসব শ্রেণির মধ্যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা আর আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ঘটনার আইনি অবস্থান আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভিসা বাতিলের পাশাপাশি নতুন আবেদনকারীদের যাচাইপ্রক্রিয়াও কঠোর করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পরীক্ষা, পরিচয় যাচাই, ভ্রমণের উদ্দেশ্য মূল্যায়ন এবং আবেদনকারীর অতীত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের যুক্তি, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি শনাক্ত করা এবং ভিসার অপব্যবহার ঠেকানো সম্ভব হবে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, যাচাইয়ের পরিধি বাড়লে বৈধ শিক্ষার্থী, গবেষক, কর্মী ও ভ্রমণকারীদেরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হতে পারে।
এ নীতির প্রভাব আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা যান। তাঁদের ভিসা বাতিল হলে পড়াশোনা, গবেষণা, আবাসন, অর্থায়ন ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে। একইভাবে বিদেশি কর্মীদের ভিসা বাতিল হলে নিয়োগকর্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন শিল্পখাতেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে বর্তমানে বাতিল হওয়া তিন লাখ ভিসার মধ্যে কতজন শিক্ষার্থী, কর্মী, পর্যটক কিংবা অন্য শ্রেণির ভিসাধারী রয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ বিভাজন প্রকাশিত হয়নি।
অভিবাসন অধিকারকর্মী ও নাগরিক অধিকারসংশ্লিষ্ট মহল কঠোর যাচাইপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ন্যায্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাঁদের আশঙ্কা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে কোনো কোনো বিদেশি নাগরিক বাড়তি নজরদারি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারেন। বিশেষ করে ফিলিস্তিনপন্থী প্রতিবাদে অংশ নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করা বিদেশি শিক্ষার্থীদের কয়েকটি ঘটনা নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায়সংগত আইনি প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া বিদেশিদেরও দেশটির আইন ও ভিসার শর্ত মেনে চলতে হবে। কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়ালে, ভিসার শর্ত ভঙ্গ করলে কিংবা নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সরকারের রয়েছে। এই যুক্তিতে প্রশাসন ভিসা যাচাই ও বাতিলের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকাশিত তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিলের ঘোষণায় বাংলাদেশিদের জন্য আলাদা কোনো সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। তাই বাংলাদেশি নাগরিকদের বিপুলসংখ্যক ভিসা বাতিল হয়েছে এমন দাবি করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য বর্তমানে পাওয়া যায়নি। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে পরিবর্তন বা নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের ভিসা প্রদান স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে আগে থেকে ইস্যু করা প্রত্যেকটি ভিসা বাতিলের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ভিসা বাতিল বলতে আগে ইস্যু করা ভিসার বৈধতা প্রত্যাহার বোঝায়। নতুন ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা কিংবা কোনো দেশের নাগরিকদের জন্য নির্দিষ্ট শ্রেণির ভিসা প্রদান স্থগিত করা আলাদা প্রশাসনিক পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত নির্দেশনায় কিছু দেশের নাগরিকদের প্রবেশ বা ভিসা প্রদানের ওপর বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। তবে ওই নির্দেশনায় এটিও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সব বৈধ ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিলের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতিতে কঠোর প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে সংখ্যাটির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য বাতিলের কারণভিত্তিক পরিসংখ্যান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভিসার ধরন, দেশভিত্তিক হিসাব এবং আপিল বা আইনি প্রতিকারের সুযোগ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত সরকারি তথ্য প্রয়োজন। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার যুক্তির পাশাপাশি স্বচ্ছতা, ব্যক্তিগত অধিকার এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এ বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।





