জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই তিরিশ বছরের সিদ্ধান্ত, অস্থায়ী সরকারের হাতে স্থায়ী অন্যায়।
এই সংবিধান যে শুধু কাগজে লেখা আইন নয়, এটি রাষ্ট্রের আত্মা।
জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই তিরিশ বছরের সিদ্ধান্ত, অস্থায়ী সরকারের হাতে স্থায়ী অন্যায়।
দেশের রাজপথ আজও অস্থির। মানুষের চোখে ভয়, কান্না, নিশ্চুপ আতঙ্ক। লাশ পড়ছে, ঘর ভাঙছে, আগুন জ্বলছে। বিরামহীন এই অস্থিরতার ভেতরেও মানুষ আশা করেছিল রাষ্ট্র অন্তত বড় সিদ্ধান্তগুলো আটকে রাখবে। প্রথমে শান্তি, তারপর নির্বাচন, তারপরই উন্নয়ন এইতো হবার কথা ছিলো!
কিন্তু সেই দেশেই আজ চট্টগ্রাম বন্দরের দুটি বড় টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তি হয়ে গেল।
ঠিক সেই সময়ে, যখন সরকারের প্রধান দায়িত্বই ছিল শুধু আইনশৃঙ্খলা ধরে রাখা আর ভোটের পরিবেশ তৈরি করা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অন্তর্বর্তী বা নেসেসিটি ভিত্তিক সরকার আদৌ কি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে? উত্তরটি খুব সহজ, কিন্তু খুব কঠিন বলেও মনে হয়।
না, পারে না।
ইন্টারিম সরকার মানে সাময়িক কাঠামো। একটি সংকটময় সময় পার হওয়ার আগ পর্যন্ত চলতি দিনের প্রশাসন চালিয়ে রাখা। এই সরকার রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী নয়, তারা সাময়িক তত্ত্বাবধায়ক। তাদের হাতে ক্ষমতা সীমিত। তাদের সিদ্ধান্ত হতে হবে সাময়িক। তাদের দায়িত্ব হলো নির্বাচন আয়োজন, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রশাসন সচল রাখা। এর বাইরে আরও বড় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া মানেই সংবিধান ও নীতি ভঙ্গ করা।
আইনশাস্ত্রে Doctorine of Necessity নামে যে নীতি আছে, সেটি আরও স্পষ্ট। এটি বলে সরকার যদি জরুরি কারণে অস্থায়ীভাবে স্থাপন হয়, তাহলে তারা কেবল সেই কাজটুকু করবে যা রাষ্ট্রকে থেমে যেতে দেয় না। তারা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেবে না, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে কোনো স্থায়ী পথে বেঁধে দেবে না। নেসেসিটি নীতির মূল বাক্যটি অনেক দেশে আদালত পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি করেছে: জরুরি ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বীকৃতি নয়। এর মানে, বন্দর, বিমান, গ্যাস, চুক্তি, টার্মিনাল, কনসেশন এসব কোনো সিদ্ধান্তই নেসেসিটি ভিত্তিক সরকারের এখতিয়ারে পড়ে না। কারণ এগুলো রাষ্ট্রের গভীরে প্রোথিত নীতি নির্ধারণের বিষয়, যেগুলো নেওয়া উচিত জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের দ্বারা।
বাংলাদেশের সংবিধানও একই কথা বলে। অনুচ্ছেদ সাত বলে রাষ্ট্রক্ষমতা জনগণের। আর অনুচ্ছেদ পঞ্চান্ন বলে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করবে নির্বাচিত মন্ত্রিসভা। অর্থাৎ দেশের কৌশলগত সম্পদ নিয়ে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া একটি অবিভক্ত অধিকার। তা নির্বাচনকালীন বা অন্তর্বর্তী কোনো সরকারের হাতে থাকার কথা নয়।
এই সংবিধান যে শুধু কাগজে লেখা আইন নয়, এটি রাষ্ট্রের আত্মা।
এখন আসি আজকের চুক্তির দিকে। লালদিয়া টার্মিনালের মতো একটি কৌশলগত স্থাপনা তিরিশ বছরের জন্য বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার অর্থ হলো তাদের হাতে বন্দরের এক বড় অংশের ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়া। পানগাঁও টার্মিনাল বাইশ বছরের জন্য গেছে আরেক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে। এই দুটি চুক্তির সময়সীমা শুনলেই বোঝা যায়, এগুলো সাময়িক সিদ্ধান্ত নয়, এগুলো স্থায়ী। আজ যে সরকার সাময়িক দায়িত্বে আছে, তারা তিরিশ বছরের দেশের পোর্ট অপারেশন কাকে দেবে, কত আয় যাবে, কিভাবে নিরাপত্তা থাকবে, এসব কিছুর দায়িত্ব তারা নেবেন কি করে?
আরো অদ্ভুত যে, চুক্তিগুলো হয়েছে এমন গতিতে যা সাধারণ প্রশাসনিক স্বাভাবিকতার বাইরে। প্রস্তাব জমা থেকে শুরু করে চুক্তি পর্যন্ত সময় লেগেছে মাত্র কয়েক দিন। এত বড় সিদ্ধান্তে এত তাড়াহুড়ো কেন, তার যুক্তি কেউই জানে না। দেশের বাণিজ্য, নিরাপত্তা, সামরিক সরঞ্জাম চলাচল সবই এই বন্দরের ভেতর দিয়ে। এমন জায়গায় বিদেশি অপারেটর বসানো মানে তথ্য, স্ক্যানিং, জাহাজ চলাচল, কন্টেইনার মুভমেন্ট, সবকিছুর ওপর একটি বিদেশি এক্সেস তৈরি করা। এটা নির্বাচিত সরকারকেও বহুবার ভাবাতে বাধ্য করে। সেখানে অস্থায়ী সরকারের এমন সিদ্ধান্ত মানুষের মনে অস্বস্তি তো জন্মাবেই।
আজ দেশের মানুষ প্রশ্ন করছে, কেন এখন। দেশের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার মুখে, রাজনৈতিক উত্তাপ সর্বোচ্চ সীমায়, প্রশাসন বিভক্ত, সাধারণ মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত, এই সময় সরকারের প্রথম কাজ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, বন্দরের টার্মিনাল হস্তান্তর করা নয়। যে দেশে নির্বাচনই ঝুলে আছে, সেই দেশে তিরিশ বছরের চুক্তি কি করে দিনের আলোয় হয়ে গেল? যদি নির্বাচন সামনে, তবে নির্বাচিত সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে, তারা কি একই চুক্তি চাইবে? এসব প্রশ্ন কি অস্থায়ী সরকারের ভাবনায় পড়েনি?
যে সিদ্ধান্তে একটি জাতির ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে, সেই সিদ্ধান্ত কখনো নীরবে নেওয়া যায় না। আজকে যা হলো, তা নীরবতার মধ্যেই হলো। এটি শুধু চুক্তি নয়, এটি তাড়াহুড়ো, এটি অস্বচ্ছতা, এটি কর্তৃত্বের সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া। আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি রাষ্ট্রের আইনগত ভিত্তির সঙ্গে যায় না।
রাষ্ট্রের সম্পদ রাষ্ট্রের। জনগণের ভবিষ্যৎ জনগণের। এবং এই ভবিষ্যতের মালিকানা নির্ধারণের অধিকার শুধুমাত্র জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের।
অস্থায়ী সরকারের নয়।
নেসেসিটি ভিত্তিক সরকারের নয়। এটাই আইনের কথা, এটা গণতন্ত্রের কথাও।
এম রায়হান কবির: মানবাধীকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।