রাশিয়ার তেলে মার্কিন ছাড়ে নতুন মোড়, ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্তের পথে
রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে সম্ভাব্য মার্কিন শুল্কের চাপ কমেছে ভারতের। এর মধ্যেই বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্তের কাছাকাছি পৌঁছানোর কথা জানিয়েছেন মার্কো রুবিও।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। একই সময়ে রাশিয়ার জ্বালানি কেনার কারণে সম্ভাব্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের চাপ সাময়িকভাবে কমানোর সিদ্ধান্ত দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সোমবার, ১৯ অক্টোবর, উজবেকিস্তানের সমরকন্দে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে এবং আলোচনা এখন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পর্যায়ে রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়াসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে ভারতের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছে। দুই দেশের মধ্যে শুল্ক, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্যিক শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে সময় লাগছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছেন উভয় পক্ষের কর্মকর্তারা।
গত ১৫ অক্টোবর ভারতের বাণিজ্যসচিব রাজেশ আগরওয়াল জানিয়েছিলেন, চুক্তির প্রথম পর্যায়ের আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং সেটির আইনি খসড়া তৈরির কাজ চলছে। তিনি দ্রুততম সময়ে চুক্তি সম্পন্ন ও স্বাক্ষরের আশাবাদও প্রকাশ করেন। এর পরদিন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর জানান, আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে অগ্রগতি হয়েছে। সর্বশেষ রুবিওর বক্তব্য সেই আশাবাদকে আরও জোরালো করেছে।
তবে আলোচনা এগিয়ে গেলেও চুক্তিটি ইতিমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। চূড়ান্ত শর্ত, পণ্যের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রয়োজন। ভারতের প্রত্যাশা, চুক্তির মাধ্যমে দেশটি মার্কিন বাজারে আরও ভালো প্রবেশাধিকার এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সুবিধাজনক শুল্ক পাবে।
এই বাণিজ্য আলোচনার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানির বিষয়টি। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। দেশটির পরিবহন, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন। তাই তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তেল সংগ্রহ ভারতের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলোর রাশিয়াবিরোধী নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যকে প্রভাবিত করেছে। এর মধ্যেও ভারত রাশিয়া থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল কিনেছে। কিন্তু রাশিয়ার জ্বালানি কেনা দেশগুলোর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং জ্বালানি ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল।
রয়টার্সের ১৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়াসংক্রান্ত আইনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের বিধানে ছাড় দিয়েছেন। নতুন ব্যবস্থাগুলো কার্যকর হলে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা দেশগুলোর পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঝুঁকি ছিল। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের কথা উল্লেখ করে এই ছাড়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রুবিওর ব্যাখ্যায়, কিছু দেশের পক্ষে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সময় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাশিয়ার তেল আমদানিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হলে দেশটির বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক প্রভাব সামলানো প্রয়োজন হতে পারে।
রাশিয়ার তেল নিয়ে সম্ভাব্য শুল্কের চাপ কমলে ভারতের রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হলে ভারতীয় পণ্যের দাম বেড়ে যেত এবং মার্কিন বাজারে সেগুলোর প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা কমে যেতে পারত।
একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া থেকে তেল কেনার সুযোগ সীমিত হলে বিকল্প সরবরাহকারীর কাছ থেকে তেল সংগ্রহ করতে হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয়, আমদানি খরচ এবং দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে মার্কিন ছাড়ের কারণে ভারতের জ্বালানি মূল্য অবশ্যই কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত সিদ্ধান্তও এতে প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হলে দুই দেশের ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং শিল্প খাতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুল্ক কতটা কমবে, কোন পণ্য সুবিধা পাবে এবং দুই পক্ষ কী ধরনের শর্তে সম্মত হবে, তা এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সমরকন্দে বৈঠক শেষে রুবিওর ভারত সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। সফরকালে মুম্বাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা। বাণিজ্য, জ্বালানি, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। সফরের অংশ হিসেবে গুজরাটের জামনগরেও যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এই সফর দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্য চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান আরও স্পষ্ট হতে পারে। তবে বৈঠক থেকে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত এসেছে বলে দাবি করার আগে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রয়োজন।
ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি নিয়ে মার্কিন নীতিতে সাময়িক ছাড় ভারতের ওপর সম্ভাব্য বাণিজ্যিক চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই ছাড়কে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞার স্থায়ী অবসান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
চুক্তির আইনি খসড়া, শুল্কের চূড়ান্ত হার এবং ছাড়ের শর্তগুলোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সম্ভাব্য সুবিধাগুলোকে নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। আপাতত রুবিওর বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাণিজ্য ও জ্বালানি—এই দুই ক্ষেত্রেই ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পরবর্তী পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে।





