ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোটার নিবন্ধন নিয়ে ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, গ্রেপ্তার ১১জন
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোটার নিবন্ধন ও নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে বিচার বিভাগ।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ভোটার নিবন্ধন ও নির্বাচনে অবৈধভাবে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ২৮ জনের বিরুদ্ধে ফেডারেল অভিযোগ আনা হয়েছে। সোমবার, ১৯ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এ তথ্য জানায়। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মার্কিন নাগরিক না হয়েও ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছেন এবং তাঁদের অধিকাংশই নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত সবাই যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা বা গ্রিন কার্ডধারী হলেও তাঁরা মার্কিন নাগরিক নন। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে ভোটার নিবন্ধনে জালিয়াতি এবং নাগরিকত্বসংক্রান্ত আবেদনে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার মতো অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
বিচার বিভাগের ঘোষিত ‘অপারেশন প্রোটেক্ট দ্য ভোট’ নামের অভিযানের অংশ হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার চারটি ফেডারেল প্রসিকিউটর কার্যালয় সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়। বিচার বিভাগের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আঞ্চলিক কার্যালয় ওই দিন ১১ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ করে। অন্যদিকে, রাজ্যজুড়ে মোট ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তাই ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং ওই দিন গ্রেপ্তারের সংখ্যা এক বিষয় নয়।
মার্কিন আইনে ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য সাধারণভাবে দেশটির নাগরিক হওয়া বাধ্যতামূলক। বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অনুমতি থাকা এবং নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার থাকা আলাদা বিষয়। গ্রিন কার্ডধারীরা যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করতে পারেন, কিন্তু সাধারণভাবে ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না। বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তদের কেউ কেউ ভোটার নিবন্ধনের সময় নিজেদের যোগ্যতা সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। কয়েকজনের বিরুদ্ধে নাগরিকত্ব পাওয়ার আবেদনে মিথ্যা বিবৃতি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। তবে এটি সম্ভাব্য সর্বোচ্চ শাস্তি; প্রত্যেক অভিযুক্তের ক্ষেত্রে একই শাস্তি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মামলার প্রমাণ, অভিযোগের ধরন এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে চূড়ান্ত শাস্তি নির্ধারিত হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনগত অধিকার রয়েছে এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এই অভিযান এমন এক সময়ে পরিচালিত হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব যাচাই এবং ডাকযোগে ভোটের নিরাপত্তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের মধ্যে বিরোধ চলছে। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, নির্বাচনে অনাগরিকদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে আরও কঠোর যাচাই প্রয়োজন। অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তারা সন্দেহের ভিত্তিতে ভোটারদের অধিকার সীমিত করা এবং যথাযথ প্রমাণ ছাড়া ভোটার তালিকা পরিবর্তনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
গত ১৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ক্যালিফোর্নিয়ার বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, রাজ্যে ২০ হাজারের বেশি এমন ব্যক্তি ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছেন, যাঁরা মার্কিন নাগরিক নাও হতে পারেন। বিচার বিভাগ চায়, এসব ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাই না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট গণনা বন্ধ রাখা হোক। তবে ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, যথাযথ যাচাই ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তির ভোটাধিকার সীমিত করা উচিত নয়।
এই বিরোধের মধ্যেই নতুন গ্রেপ্তার ও অভিযোগের ঘটনা রাজনৈতিক আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, নির্বাচনে যোগ্য নাগরিকদের ভোটের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। তবে পৃথক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং পুরো রাজ্যের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ব্যাপক অনিয়ম প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভোটার নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের সময় ভুল শনাক্তকরণের ঝুঁকি। কোনো ব্যক্তির নাম বা পরিচয় অভিবাসনসংক্রান্ত নথির সঙ্গে না মিললেই তিনি নাগরিক নন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। নাগরিকত্ব যাচাইয়ে নির্ভরযোগ্য নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং প্রযোজ্য আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অভিযোগের তদন্তের পাশাপাশি বৈধ ভোটারদের অধিকার রক্ষাও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
যুক্তরাষ্ট্রে অনাগরিকদের ভোট দেওয়ার ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিনের। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও নির্বাচনী পর্যালোচনায় এ ধরনের ভোটের ঘটনা অত্যন্ত বিরল বলে উঠে এসেছে। এমন ঘটনাগুলো নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তন করেছে, এমন প্রমাণও সাধারণভাবে পাওয়া যায়নি। তাই নতুন অভিযানের গুরুত্ব থাকলেও এর ভিত্তিতে ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থায় ব্যাপক জালিয়াতি হচ্ছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
সামনে অভিযুক্তদের আদালতে হাজির করা, অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য গ্রহণ এবং মামলার প্রমাণ পর্যালোচনার প্রক্রিয়া এগোবে। তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে আরও বিস্তারিত জানা যেতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার ও ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষের মধ্যে ভোটার তালিকা এবং ডাকযোগে ভোট গণনা নিয়ে চলমান আইনি বিরোধের ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আদালতের সিদ্ধান্ত নির্বাচনী প্রশাসন, ভোটারদের অধিকার এবং কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকারের ক্ষমতার সীমা নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপকে প্রভাবিত করতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোটার নিবন্ধন ও নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে ২৮ জনের বিরুদ্ধে ফেডারেল অভিযোগ আনা হয়েছে এবং বিচার বিভাগের একটি আঞ্চলিক কার্যালয় ১১ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটার যোগ্যতা ও নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও সামনে এনেছে। তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়া এবং রাজ্যের নির্বাচনী ব্যবস্থার সামগ্রিক অবস্থা মূল্যায়ন করা পৃথক বিষয়।





