যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যবিমা হারানোর ঝুঁকিতে লাখো অভিবাসী, দুশ্চিন্তায় পরিবারগুলো
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ফেডারেল নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী ও মানবপাচারের শিকার কিছু বৈধ অভিবাসী মেডিকেইড স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা হারিয়েছেন। এতে স্বল্প আয়ের অভিবাসী পরিবারগুলোর চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে নিয়মটি সব অভিবাসীর জন্য এক নয়; গ্রিন কার্ডধারীরা এই নির্দিষ্ট পরিবর্তনের আওতায় পড়েননি বলে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য স্বাস্থ্যবিমা এখন গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। দেশটির মেডিকেইড কর্মসূচিতে নতুন ফেডারেল বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার পর কিছু বৈধ অভিবাসী সরকারি স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা হারিয়েছেন। গত ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া পরিবর্তনটি শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী, মানবপাচার ও পারিবারিক সহিংসতার শিকার নির্দিষ্ট কিছু মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় প্রভাব ফেলেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ফলে কয়েক লাখ মানুষ স্বাস্থ্যবিমা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন বা ইতিমধ্যে সুবিধা হারিয়েছেন।
এই খবর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশি নাগরিকদের সবাই এই পরিবর্তনের আওতায় পড়েছেন—এমন তথ্য নেই। কারও স্বাস্থ্যবিমা বন্ধ হবে কি না, তা নির্ভর করে তাঁর অভিবাসন মর্যাদা, কোন কর্মসূচির আওতায় তিনি সুবিধা পাচ্ছেন এবং সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের নিয়মের ওপর।
মেডিকেইড হলো যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকারের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি। যোগ্য স্বল্প আয়ের ব্যক্তি, পরিবার, শিশু, প্রবীণ এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহনে এটি সহায়তা করে। তবে এই কর্মসূচির যোগ্যতা সবার জন্য একই নয়। আয়, বসবাসের অঙ্গরাজ্য, বয়স, অভিবাসন মর্যাদা এবং অন্যান্য শর্তের ভিত্তিতে সুবিধা নির্ধারিত হয়।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন বিধিনিষেধে কিছু শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী এবং মানবপাচারের শিকার ব্যক্তি মেডিকেইড সুবিধা হারিয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গ্রিন কার্ডধারীরা এই নির্দিষ্ট ১ অক্টোবরের পরিবর্তনের আওতায় পড়েননি। তাই এই খবরকে সব বৈধ অভিবাসীর স্বাস্থ্যবিমা বাতিলের ঘোষণা হিসেবে প্রচার করা সঠিক হবে না।
স্বাস্থ্যবিমা না থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ, নিয়মিত পরীক্ষা, ওষুধ এবং হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ নিজেকেই বহন করতে হতে পারে। যেসব পরিবারের আয় সীমিত, তাঁদের জন্য এই ব্যয় সামলানো কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী মানুষ এবং নিয়মিত ওষুধের ওপর নির্ভরশীল রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে অ্যারিজোনার মারিয়া চাকনের পরিবারের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর ছেলে গুরুতর শারীরিক সমস্যার কারণে ভেন্টিলেটর, খাবার দেওয়ার নল এবং নিয়মিত ওষুধের ওপর নির্ভরশীল। পরিবারটির দাবি, মেডিকেইডের সহায়তায় ছেলের চিকিৎসার বড় ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছিল। বিমার সুবিধা হারানোর পর ভবিষ্যতের চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ কীভাবে সামলাবেন, তা নিয়ে পরিবারটি উদ্বেগে পড়ে। এই ঘটনা দেখায়, স্বাস্থ্যবিমার নিয়মে পরিবর্তন কোনো কোনো পরিবারের জন্য কতটা গুরুতর হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রথমে নিজেদের স্বাস্থ্যবিমার ধরন যাচাই করা উচিত। কেউ যদি নিয়োগকর্তার মাধ্যমে বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা পান, তাহলে এই মেডিকেইড পরিবর্তন সরাসরি তাঁর সেই বিমা বাতিল করে না। আবার কেউ যদি মেডিকেইডের সুবিধাভোগী হন, তাহলে তাঁর যোগ্যতা নতুন নিয়মের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, ক্যালিফোর্নিয়া, মিশিগান, টেক্সাস ও ফ্লোরিডায় বসবাসকারী বাংলাদেশি পরিবারগুলো নিজ নিজ অঙ্গরাজ্যের মেডিকেইড দপ্তর বা স্বাস্থ্যবিমা সহায়তা কেন্দ্রে যোগাযোগ করে বর্তমান অবস্থা জানতে পারেন। কোনো চিঠিতে সুবিধা বন্ধের কথা বলা হলে সেটির কার্যকর হওয়ার তারিখ, আপিলের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের নির্দেশনা মনোযোগ দিয়ে পড়া জরুরি।
প্রথমত, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কাছ থেকে লিখিতভাবে জানতে হবে কেন সুবিধা বন্ধ করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্ত ভুল বলে মনে হলে নোটিশে উল্লেখ করা সময়সীমার মধ্যে আপিল করা যায় কি না, তা যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, অন্য কোনো স্বাস্থ্যবিমা বা অঙ্গরাজ্যভিত্তিক চিকিৎসা সহায়তার সুযোগ রয়েছে কি না, তা জানতে হবে। প্রয়োজন হলে অভিবাসন আইনজীবী, স্বাস্থ্যবিমা পরামর্শক বা স্বীকৃত কমিউনিটি সহায়তা সংস্থার সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন বিধিনিষেধের ফলে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর মেডিকেইড সুবিধা বন্ধ হয়েছে। তবে সব অঙ্গরাজ্যের জন্য একই সংখ্যা প্রযোজ্য নয়, এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে ঠিক কতজন এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য পৃথক হিসাব পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে আতঙ্কিত না হয়ে নিজেদের বিমার ধরন ও যোগ্যতা যাচাই করা। স্বাস্থ্যবিমা, চিকিৎসার ব্যয় এবং অভিবাসনসংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তনের খবর নিয়মিত অনুসরণ করলে প্রয়োজনীয় সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।





