মধ্যপ্রাচ্যের পথে আরও এক মার্কিন বিমানবাহী রণতরি, ইরান ঘিরে বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা
জাপানে যাত্রাবিরতির পর মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার প্রস্তুতিতে মার্কিন রণতরি থিওডোর রুজভেল্ট। ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা ও নৌ অবরোধে বাড়ছে উদ্বেগ।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি থিওডোর রুজভেল্টের মধ্যপ্রাচ্য অভিমুখে মোতায়েনকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে জাপানের ইয়োকোসুকা বন্দরে পৌঁছানোর পর রণতরিটি পরবর্তী সামরিক কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এটি কবে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় নিশ্চিত করা যায়নি।
মার্কিন নৌবাহিনী ও সামরিক বিষয়ক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, থিওডোর রুজভেল্ট গত ২৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে। প্রায় ১৯ দিনের যাত্রা শেষে ১৬ অক্টোবর এটি জাপানের ইয়োকোসুকা বন্দরে পৌঁছায়। সেখানে রণতরি ও এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সরবরাহ গ্রহণ এবং যুক্তরাষ্ট্র-জাপানের যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির জন্য অবস্থান করে। নৌবিষয়ক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বহরের পরবর্তী গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্য হওয়ার কথা। তবে জাপানে অবস্থানের পরপরই এটি মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সর্বশেষ সরকারি ঘোষণা প্রয়োজন।
থিওডোর রুজভেল্ট যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরিগুলোর একটি। এর সঙ্গে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ, নজরদারি ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সহায়ক সামরিক সরঞ্জাম কাজ করে। একটি বিমানবাহী রণতরি বহর সমুদ্র থেকে আকাশপথে অভিযান পরিচালনা, আকাশ প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং দূরবর্তী এলাকায় সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ফলে এই বহরের মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
এবারের মোতায়েনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘সিহক’ নামের চালকবিহীন নৌযান। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত প্রধান হাং কাও ১৫ অক্টোবরের কাছাকাছি সময়ে এক সামরিক আলোচনায় জানান, থিওডোর রুজভেল্টের বহর চালকবিহীন পৃষ্ঠজলযানসহ মোতায়েন হয়েছে। এটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি বহরের সঙ্গে বড় আকারের চালকবিহীন নৌযান ব্যবহারের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এ ধরনের নৌযান নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ, সমুদ্রপথ পর্যবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন সামরিক সহায়তামূলক কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে সিহককে নির্দিষ্ট অস্ত্রে সজ্জিত বা সরাসরি হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে বলে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া দাবি করা উচিত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পেছনে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত, উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে বাধা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বিরোধ আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রয়টার্সের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইরানের পদক্ষেপ এবং বিভিন্ন জাহাজের ওপর হামলার ঝুঁকি সামুদ্রিক বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই প্রণালি দিয়ে সংঘাতের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাণিজ্য পরিবাহিত হতো। ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর রাখার অভিযানও চলছে। ৫ অক্টোবর প্রকাশিত এক ঘোষণায় বলা হয়, মার্কিন বাহিনী অবরোধ বাস্তবায়নের সময় ১৩০টি বাণিজ্যিক জাহাজকে পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে। এই পদক্ষেপের ফলে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তবে অবরোধের আওতা ও কার্যক্রম সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের পাশাপাশি স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যও বিবেচনা করা জরুরি।
মার্কিন নৌবাহিনীর ১৩ অক্টোবরের বহরসংক্রান্ত প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে জর্জ ওয়াশিংটন এবং জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ নামের দুটি বিমানবাহী রণতরির উপস্থিতির তথ্য ছিল। একই সময়ে থিওডোর রুজভেল্ট প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থান করছিল। ফলে নতুন বহরটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছালে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তবে জাহাজের অবস্থান ও মোতায়েনের তথ্য দ্রুত পরিবর্তিত হয়; তাই নির্দিষ্ট দিনে ঠিক কতটি রণতরি একই অঞ্চলে কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা সর্বশেষ নৌবাহিনীর তথ্য দিয়ে যাচাই করতে হবে।
সামরিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, অতিরিক্ত রণতরি মোতায়েনের অর্থ সব সময় তাৎক্ষণিক হামলার সিদ্ধান্ত নয়। এটি সম্ভাব্য অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিদ্যমান বাহিনীকে বিশ্রাম ও সহায়তা দেওয়া, মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা প্রতিপক্ষের ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টির অংশ হতে পারে। তবে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যে নতুন সামরিক শক্তি যুক্ত হলে ভুল হিসাব, পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ এবং সংঘাত বিস্তারের ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন দেখা দিলে তেল পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, জাহাজের বিমা খরচ বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতেও তা অনুভূত হতে পারে।
থিওডোর রুজভেল্টের মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সামরিক প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে রণতরিটি জাপান থেকে ঠিক কখন মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে এবং পৌঁছানোর পর কী ধরনের দায়িত্ব পালন করবে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। পরিস্থিতির পরবর্তী পরিবর্তন নির্ভর করবে সামরিক মোতায়েন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।





