গোপন কূটনৈতিক তৎপরতা: টোকিওতে ফের যুক্তরাষ্ট্র–মিয়ানমার বৈঠক, নেপথ্যে নিরাপত্তা ও খনিজের হিসাব
মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকারের সঙ্গে টোকিওতে আবারও আলোচনায় বসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। আলোচনার বিষয়বস্তু ও সম্ভাব্য ফলাফল ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কূটনৈতিক আগ্রহ।
যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকারের কর্মকর্তারা জাপানের রাজধানী টোকিওতে আবারও গোপন বৈঠকে বসেছেন। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক এক মাসের মধ্যে দুই পক্ষের দ্বিতীয় দফার আলোচনা বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়। মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে দেশটির সামরিক নেতৃত্বের সম্পর্কের যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে ধারাবাহিক এই যোগাযোগ নতুন করে কূটনৈতিক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
তবে বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং নিরাপত্তা, অনলাইন প্রতারণা দমন, মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষা এবং কৌশলগত সম্পদ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সীমিত পরিসরে যোগাযোগ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত মিলছে।
আটক মার্কিন নাগরিক ও প্রতারণাকেন্দ্র নিয়ে আলোচনা
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে অনুষ্ঠিত আগের বৈঠকে আটক এক মার্কিন ব্যবসায়ীর মুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।
মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় এসব প্রতারণাকেন্দ্র থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আর্থিক জালিয়াতি পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব এবং অনলাইন সম্পর্কের মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জন করে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। এসব অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এ ধরনের অপরাধ দমন গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের বিষয়। মার্কিন নাগরিকদের অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের কার্যক্রম সীমিত করতে ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
তবে টোকিওর সর্বশেষ বৈঠকে প্রতারণাকেন্দ্র নিয়ে কী ধরনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট অভিযান বা সহযোগিতার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে আটক মার্কিন ব্যবসায়ীর মুক্তির বিষয়ে নতুন কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তের তথ্যও পাওয়া যায়নি।
টোকিওর বৈঠকে কারা অংশ নেন
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণাবিষয়ক সহকারী সচিব মাইকেল ভ্যান্স নেতৃত্ব দেন। যুক্তরাষ্ট্রের এক ডজনের বেশি কর্মকর্তা এতে অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মিয়ানমারের পক্ষে কারা উপস্থিত ছিলেন, তা নিশ্চিত করতে পারেনি সংবাদ সংস্থাটি। বৈঠকের পূর্ণাঙ্গ আলোচ্যসূচি, অংশগ্রহণকারীদের তালিকা কিংবা কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বৈঠকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যের পাশাপাশি কিছু বিষয় এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে তারা উভয় পক্ষের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ করেছে। তবে নির্দিষ্ট আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি জাপান। যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের পক্ষ থেকেও বৈঠকের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
বিরল খনিজ সম্পদ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আগ্রহ
নিরাপত্তা ও প্রতারণা দমনের পাশাপাশি মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকা খনিজ সম্পদও আন্তর্জাতিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। এসব খনিজ বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রাংশ, উন্নত ইলেকট্রনিকস এবং বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
বিশ্বব্যাপী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদনশিল্পের প্রসারের সঙ্গে এসব খনিজের চাহিদা বেড়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শিল্পোন্নত দেশের জন্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে।
মিয়ানমারের কিছু সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিরল মৃত্তিকা খনিজের মজুত ও উৎপাদন কার্যক্রম রয়েছে। বিশেষ করে চীনের সীমান্তসংলগ্ন এলাকাগুলো থেকে এসব খনিজের সরবরাহ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা, পরিবেশগত ক্ষতি এবং সীমিত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের কারণে এসব অঞ্চলে খনিজ উত্তোলন ও বাণিজ্য পরিচালনা জটিল।
চীনের প্রভাবও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিরল মৃত্তিকা খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় চীনের বড় ভূমিকা থাকায় বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার আগ্রহ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। মিয়ানমারের সম্পদ সেই বৃহত্তর কৌশলগত আলোচনার অংশ হতে পারে। তবে টোকিওর বৈঠকে খনিজ সম্পদ নিয়ে সরাসরি আলোচনা হয়েছে কিংবা কোনো চুক্তি হয়েছে এমন তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়।
সামরিক অভ্যুত্থানের পরও সম্পর্কের জটিলতা
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র সংঘাত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেয়।
অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং মানবিক সহায়তা পরিস্থিতি গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকারের প্রতিনিধিদের ধারাবাহিক যোগাযোগ তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এর রাজনৈতিক অর্থ এখনই নির্ধারণ করা কঠিন। কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এক বিষয় নয়। নির্দিষ্ট নিরাপত্তা বা অপরাধ দমনের স্বার্থে আলোচনায় বসা মানেই সামরিক নেতৃত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
আঞ্চলিক কূটনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে
টোকিওতে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলো যুক্তরাষ্ট্র, মিয়ানমার ও জাপানের স্বার্থের পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। মিয়ানমারের ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, সীমান্তবর্তী অপরাধ এবং চীনের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনলাইন প্রতারণা দমন ও নাগরিকদের নিরাপত্তা সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত প্রশাসনের জন্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বজায় রাখা কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। জাপানও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে এই বৈঠকের মাধ্যমে কোনো নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কিংবা বিরল খনিজ সম্পদ নিয়ে সহযোগিতা শুরু হচ্ছে এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত নিশ্চিত তথ্য নেই।
টোকিওতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকারের কর্মকর্তাদের দ্বিতীয় দফার বৈঠক দুই পক্ষের মধ্যে সীমিত কূটনৈতিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছে। আলোচনার প্রকৃত উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য সমঝোতা এবং ভবিষ্যৎ প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও পরবর্তী নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন প্রকাশের অপেক্ষা করতে হবে।





