ব্রেকিং
রকেটের প্রযুক্তিতে আকাশে উড়ল টেসলা! ইলন মাস্কের নতুন প্রদর্শনী ঘিরে বিশ্বজুড়ে আলোচনাযুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে ভয়াবহ বন্দুক হামলা, নিহত তিন শিশু ও শিক্ষক, সন্দেহভাজন কিশোরও নিহত বলে দাবিগোপন কূটনৈতিক তৎপরতা: টোকিওতে ফের যুক্তরাষ্ট্র–মিয়ানমার বৈঠক, নেপথ্যে নিরাপত্তা ও খনিজের হিসাবযুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কেনা এখন স্বপ্ন, মাসে ৩ হাজার ডলারের বেশি খরচে চাপে পরিবারবাংলাদেশে ফেসবুকের জনপ্রিয়তায় মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত, মেটার সঙ্গে আলোচনায় নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা

চীনা যন্ত্রাংশে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা হুথিদের, উদ্বেগ বাড়ছে সৌদি আরবের

চীনা উৎসের বিশেষ যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে ইয়েমেনের হুথিরা, এমন তথ্য প্রকাশের পর মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে।

চীনা যন্ত্রাংশে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা হুথিদের, উদ্বেগ বাড়ছে সৌদি আরবের
চীনা যন্ত্রাংশে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা হুথিদের, উদ্বেগ বাড়ছে সৌদি আরবের

ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের যোদ্ধারা চীনা উৎস থেকে সংগৃহীত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে অস্ত্র গবেষণা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বরাতে ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদে এ তথ্য জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। গবেষণায় বলা হয়েছে, ইয়েমেনের কর্তৃপক্ষের জব্দ করা চালানে এমন কিছু বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে, যেগুলো ইরানের তৈরি একটি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিষয়টি সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য রয়েছে। চীনা উৎসের যন্ত্রাংশ পাওয়া যাওয়ার অর্থ এই নয় যে চীন সরকার সরাসরি হুথিদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত গবেষণার মূল বিষয় হলো, চীনা সরবরাহকারী ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য কিছু উপাদান হুথিদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা হয়েছে। এসব চালানের সঙ্গে চীন সরকারের সরাসরি নির্দেশ বা অনুমোদনের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে প্রমাণ করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের কর্তৃপক্ষ গত জুলাইয়ে দুটি সন্দেহজনক চালান আটকানোর তথ্য প্রকাশ করেছিল। পরবর্তী অনুসন্ধানে এসব চালানে ক্ষেপণাস্ত্রের কাঠামো ও চালনা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষায়িত ধাতব অংশ, রকেট ইঞ্জিনের পেছনের আবরণ, অগ্রভাগের অংশ, ইঞ্জিন চালু করার উপাদান এবং উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে এমন পদার্থ শনাক্ত করা হয়। গবেষকদের মতে, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম একসঙ্গে পাওয়া যাওয়ায় এগুলো ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।

অস্ত্র গবেষকদের ধারণা, হুথিদের পরিকল্পিত ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার সঙ্গে ইরানের খাইবার শেকান ধরনের মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের নকশাগত মিল থাকতে পারে। এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। তবে জব্দ করা যন্ত্রাংশের ভিত্তিতে হুথিরা ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। গবেষণাটি মূলত তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা এবং সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।

হুথি আন্দোলন ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী, যারা আনসারুল্লাহ নামেও পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে তারা দেশটির রাজধানী সানা-সহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে তাদের সংঘাত বহু বছর ধরে চলমান। সৌদি আরবও এই সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হিসেবে জড়িত। দুই পক্ষের লড়াইয়ে ইয়েমেনের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহারের সক্ষমতা বেড়েছে। আগে তারা পুরোনো অস্ত্র এবং বাইরে থেকে আসা সম্পূর্ণ অস্ত্রব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। এখন বিভিন্ন উৎস থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, স্থানীয় পর্যায়ে সংযোজন এবং নিজস্ব প্রযুক্তিগত দক্ষতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলে গবেষকেরা মনে করছেন। এর ফলে তাদের অস্ত্র সরবরাহের পথ বন্ধ করা আগের তুলনায় কঠিন হতে পারে।

ইরানের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান হুথিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাও ইরানি নকশার সঙ্গে হুথিদের ব্যবহৃত কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের মিল তুলে ধরেছে। তবে হুথিদের প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্ত সরাসরি তেহরান নিয়ন্ত্রণ করে—এমন দাবি প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা রয়েছে।

লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সঙ্গে হুথিদের যোগাযোগ এবং সামরিক জ্ঞান বিনিময়ের বিষয়টিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে আলোচিত হয়েছে। ইরান, হুথি ও হিজবুল্লাহর সম্পর্ককে অনেক বিশ্লেষক বৃহত্তর আঞ্চলিক মিত্রজোটের অংশ হিসেবে দেখেন। কিন্তু রাশিয়া সরাসরি হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে—এমন দাবি সমর্থন করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এই নির্দিষ্ট গবেষণায় পাওয়া যায়নি। তাই ইরান, চীন, রাশিয়া ও হিজবুল্লাহ সবাই একইভাবে হুথিদের সামরিক সহায়তা দিচ্ছে—এমন একক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তথ্যগতভাবে যথাযথ নয়।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে, এ ধরনের গোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে ইরান সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি না নিয়েও প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে ইরানের আঞ্চলিক নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মূল্যায়ন হিসেবে দেখা উচিত; প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে আলাদা প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।

সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, হুথিরা যদি আরও নির্ভুল ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সক্ষম হয়, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো এবং অন্যান্য কৌশলগত স্থাপনা নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সৌদি আরবের মতো বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের দেশকে সব দিক থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা বজায় রাখতে হয়। প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের সংখ্যা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়লে প্রতিরক্ষা ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে।

এর প্রভাব শুধু সৌদি আরব বা ইয়েমেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে, পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়তে পারে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামেও চাপ তৈরি হতে পারে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে খাদ্য, ওষুধ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

চীনের অবস্থানও এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিং বলেছে, তারা সামরিক পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলে এবং দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্যের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে। দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্য বলতে এমন যন্ত্রাংশ বা উপাদান বোঝায়, যা বেসামরিক শিল্পেও ব্যবহৃত হতে পারে, আবার সামরিক উৎপাদনেও কাজে লাগতে পারে। তাই কোনো পণ্যের উৎস চীনে পাওয়া গেলেই সরাসরি রাষ্ট্রীয় সামরিক সহায়তা প্রমাণিত হয় না। একই সঙ্গে, এসব পণ্য কীভাবে মধ্যস্থতাকারী, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা গোপন সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে নিষিদ্ধ গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছেছে, তা তদন্ত করা জরুরি।

সাম্প্রতিক গবেষণাটি হুথিদের অস্ত্র উৎপাদনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার জটিলতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। তবে চীন সরকারের সরাসরি সহায়তা, রাশিয়ার ভূমিকা এবং ইরানের নিয়ন্ত্রণের মাত্রা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন। পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে অস্ত্রের যন্ত্রাংশের সরবরাহ বন্ধ করা, আঞ্চলিক কূটনীতি জোরদার করা এবং ইয়েমেনের সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার ওপর।

ট্যাগ: ইয়েমেনহুথিচীনইরানসৌদিআরবক্ষেপণাস্ত্র

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।