সংবাদমাধ্যমের সম্প্রচার বন্ধের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে বিচার বিভাগের তদন্তের মুখে পাঁচ টেলিভিশন প্রতিষ্ঠান
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ পাঁচটি বড় টেলিভিশন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে; হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্প্রচার বন্ধের ঘটনাকে ঘিরে আইনি প্রশ্ন উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে হোয়াইট হাউসের সংবাদ সংগ্রহ ও সম্প্রচার বন্ধ রাখার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাঁচটি বড় টেলিভিশন সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। শনিবার, ১০ অক্টোবর তদন্তের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। রোববার, ১১ অক্টোবর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিষয়টি বিস্তারিত জানানো হয়। এই তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলোর পারস্পরিক সিদ্ধান্ত, প্রতিযোগিতা আইন এবং হোয়াইট হাউসের সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ নিয়ে চলমান বিরোধ।
গত মাসে হোয়াইট হাউসের সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ থেকে সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোকে বাদ দেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। এর প্রতিবাদে হোয়াইট হাউসের নিয়মিত সংবাদ সম্প্রচারকারী পাঁচটি বড় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান কিছু সময়ের জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংবাদ কার্যক্রমের সম্প্রচার বন্ধ রাখে। এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে এবিসি, সিবিএস, সিএনএন, ফক্স এবং এনবিসি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের মুখপাত্র এমিলি কোভিংটন জানিয়েছেন, প্রতিযোগী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত বর্জন কোনো কোনো পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতা আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। সেই সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতেই তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এই বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সরকারি সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ এবং সংবাদ সম্প্রচারের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। হোয়াইট হাউসের সংবাদ সংগ্রহকারী দল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয়। পালাক্রমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই দলের দায়িত্ব পালন করে এবং তাদের সংগৃহীত তথ্য ও ভিডিও অন্য সংবাদমাধ্যমের কাছেও পৌঁছায়। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত অন্য সংবাদমাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহেও প্রভাব ফেলতে পারে।
গত মাসে প্রশাসন সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোকে হোয়াইট হাউসে প্রবেশের সুযোগ থেকে বাদ দিলে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো আদালতের দ্বারস্থ হয়। পরে বিচারকের দেওয়া সাময়িক সুরক্ষার ফলে তাদের প্রবেশাধিকারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত হয়। আদালতের এই পদক্ষেপের পর সংবাদ সংগ্রহের কার্যক্রম আবার চালু হয়। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরোধ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের প্রবেশাধিকার নিয়ে এই বিরোধের পাশাপাশি সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্তটি এখন বিচার বিভাগের নজরে এসেছে। তদন্তকারীরা দেখতে চাইছেন, প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা আইনের আওতায় পড়ে কি না। তবে তদন্তের পরিধি, সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে এখনো সব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি কর্মকর্তাদের সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের কাজ হলো সরকারি সিদ্ধান্ত, নীতিমালা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে জনগণকে তথ্য দেওয়া। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমগুলোকে প্রযোজ্য আইন মেনে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তও নিতে হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান সংবাদ সম্প্রচার বন্ধ রাখলে সেটি সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতার প্রশ্ন, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার প্রশ্ন অথবা উভয় বিষয়েই আলোচনার জন্ম দিতে পারে। কোন আইনি ব্যাখ্যা এই ঘটনায় প্রযোজ্য হবে, তা তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকতা সুরক্ষা কমিটি তদন্তের সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালক হোসে জামোরা সতর্ক করে বলেছেন, সংবাদমাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ রক্ষার পদক্ষেপকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে সরকারি তদন্ত ব্যবহার করা উচিত নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ প্রয়োজন।
তবে বিচার বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তের উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, তা নির্ধারণ করা। তদন্ত শুরু হওয়া নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে বিষয়টি কোন দিকে এগোবে।
যুক্তরাষ্ট্রে এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন প্রশাসন ও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের মধ্যে সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ নিয়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। হোয়াইট হাউসের সংবাদ কার্যক্রমে কোন প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারবে, কীভাবে সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ বণ্টন করা হবে এবং সংবাদমাধ্যমের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের আইনি সীমা কোথায়—এসব প্রশ্ন এখন আলোচনায় রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্প্রচার বন্ধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাঁচটি বড় টেলিভিশন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তদন্ত নতুন আইনি বিতর্ক তৈরি করেছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত রায় বা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তের ফলাফল প্রকাশের পরই বোঝা যাবে, এই ঘটনা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রতিযোগিতা আইন এবং সরকারি সংবাদ সংগ্রহের নীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।





