“অস্ত্রধারী দেখলেই এসএমজি দিয়ে ব্রাশফায়ার”: চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে নতুন বিতর্ক — আইনশৃঙ্খলা না বিচারবহির্ভূত সংস্কৃতি?
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল— অবিচার নয়, আইনের শাসন ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। কিন্তু চট্টগ্রাম পুলিশের এই নির্দেশ সেই প্রত্যাশায় ফাটল ধরিয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।
“অস্ত্রধারী দেখলেই এসএমজি দিয়ে ব্রাশফায়ার”: চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে নতুন বিতর্ক — আইনশৃঙ্খলা না বিচারবহির্ভূত সংস্কৃতি?
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজের নির্দেশে আবারও তীব্র আলোচনায় এসেছে ‘দেখামাত্র গুলি’ সংস্কৃতি। মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) দুপুরে নিজস্ব বেতার বার্তায় তিনি নগর পুলিশের টহল টিমগুলোকে নির্দেশ দেন— অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী দেখলেই সাবমেশিনগান (এসএমজি) থেকে ব্রাশফায়ার করতে হবে।
পুলিশ কমিশনারের এই ঘোষণা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরে নয়, বরং রাজনৈতিক ও মানবাধিকার অঙ্গনেও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকে বলছেন, এটি বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যুগে ফেরার ইঙ্গিত বহন করছে।
গত কয়েক সপ্তাহে চট্টগ্রামে ধারাবাহিক সহিংস ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে গুলিবর্ষণে নিহত হয় একাধিক ব্যক্তি, পরে হালিশহরে প্রকাশ্যে খুন হন আকবর নামের এক ব্যক্তি।
এই প্রেক্ষাপটেই কমিশনার হাসিব আজিজ টহল টিমগুলোকে শটগান ও চায়না রাইফেল প্রত্যাহার করে এসএমজি বহনের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন,
“বাইরে থেকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা এসে নগরবাসীকে গুলি করে যাবে, তা হতে পারে না। এজন্য দেখামাত্র ব্রাশফায়ারের নির্দেশ দিয়েছি। তবে নিরস্ত্র নাগরিকের ওপর এটি প্রযোজ্য নয়।”
পাশাপাশি নগরে স্থায়ী চেকপোস্ট ৭টি থেকে বাড়িয়ে ১৩টি করা হয়েছে। সিএমপি সূত্রে জানা গেছে, কমিশনার বলেছেন “সব দায় আমি নেব।”
এই নির্দেশ এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশে ক্ষমতায় আছেন নোবেলজয়ী শান্তিকর্মী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার।
ড. ইউনুসের সরকার মানবাধিকার ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, ঠিক এমন সময়ে ‘দেখামাত্র গুলি’ নীতির ঘোষণা অনেককেই বিস্মিত করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—
“যে অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়েছেন— বিচারবহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ার, নিখোঁজ— সেই একই পথে নতুন সরকার হাঁটছে কি না, এই প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে।”
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ‘দেখামাত্র গুলি’ নির্দেশ সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।
অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন,
“এ ধরনের নির্দেশ পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ববোধের চেয়ে ভয় তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করে। বাস্তবে এটি নিরস্ত্র নাগরিকের ওপরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।”
অন্যদিকে পুলিশের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“চট্টগ্রামে অস্ত্রবাজ ও ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের দমন জরুরি। প্রতিদিন টার্গেট কিলিং বাড়ছে। কমিশনারের বক্তব্য হয়তো পরিস্থিতির চাপে এসেছে, কিন্তু বাস্তবে এটি মাঠে ভুল ব্যাখ্যা পেতে পারে।”
একই বক্তব্যে কমিশনার বলেন, “ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ সংগঠন। তারা রাস্তায় নামলে গ্রেফতার করা হবে, গুলি নয়।”
এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়— সরকার রাজনৈতিক হুমকি ও অস্ত্রবাহী সহিংসতাকে পৃথকভাবে দেখছে।
কিন্তু সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন—
“রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ‘গুলি নয়, গ্রেফতার’— এমন দ্বৈত নীতি কি আইনের চোখে সবাই সমান থাকার নীতির পরিপন্থী নয়?”
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল— অবিচার নয়, আইনের শাসন ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।
কিন্তু চট্টগ্রাম পুলিশের এই নির্দেশ সেই প্রত্যাশায় ফাটল ধরিয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে,
“ড. ইউনুস সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ— আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং একইসঙ্গে মানবাধিকারের মানদণ্ড রক্ষা করা। এই দুইয়ের ভারসাম্য হারালে সরকার আন্তর্জাতিক মহলে কঠিন সমালোচনার মুখে পড়বে।”
চট্টগ্রাম পুলিশের এই ‘ব্রাশফায়ার’ নীতি আপাতদৃষ্টিতে সন্ত্রাস দমনের কৌশল হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহারের নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন।
বাংলাদেশ কি আবারও বিচারবহির্ভূত সংস্কৃতির দিকে যাচ্ছে, নাকি এটি কেবলই নিরাপত্তা ব্যবস্থার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া—
এখন সেটিই দেখার বিষয়।
photo : TBS