যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ট্রাম্পের নির্বাচনী সমাবেশে বিক্ষোভ, রিপাবলিকানদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
টেক্সাসে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের পক্ষে প্রচারে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়লেন ট্রাম্প, নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ট্রাম্পের নির্বাচনী সমাবেশে বিক্ষোভ, রিপাবলিকানদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টেক্সাসে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে একাধিক বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন। বুধবার রাতে সান আন্তোনিওর ফ্রিম্যান কলোসিয়ামে অনুষ্ঠিত সমাবেশে একাধিক বিক্ষোভকারী ট্রাম্পের বক্তব্যে বাধা দেন। কয়েকজনকে পুলিশ সরিয়ে নেয়। ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত টেক্সাসেও দলটির অবস্থান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের এবারের টেক্সাস সফর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি এক মাসের মধ্যে তাঁর তৃতীয় টেক্সাস সফর। মূল উদ্দেশ্য ছিল রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের পক্ষে সমর্থন জোরদার করা। প্যাক্সটন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে টালারিকো এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ফলে রিপাবলিকান নেতৃত্বের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
টেক্সাস দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আগের তুলনায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি এবং ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সময়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও জাতীয় পর্যায়ে চাপের মধ্যে রয়েছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনী আসনগুলোর বড় অংশে রিপাবলিকান প্রার্থীরা নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান থেকে নিজেদের দূরে রাখছেন। ৬২টি ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচনী লড়াই বিশ্লেষণ করে রয়টার্স দেখতে পেয়েছে, ৪১টি ক্ষেত্রে রিপাবলিকান প্রার্থীরা অন্তত কোনো একটি নীতিগত বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। ইরান, তথ্যকেন্দ্র এবং মাংস আমদানির মতো বিষয়গুলোতে এমন দূরত্ব বিশেষভাবে দেখা গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রিপাবলিকান প্রার্থীরা সবাই ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান করছেন। বরং অনেক প্রার্থী কৌশলগতভাবে তাঁর জনপ্রিয় নীতিগুলোকে সমর্থন করলেও স্থানীয় ভোটারদের কাছে নিজেদের আলাদা অবস্থান তুলে ধরছেন। কারণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে স্বাধীন ভোটারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ট্রাম্পের টেক্সাস সমাবেশেও এই রাজনৈতিক চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি প্যাক্সটনের প্রশংসা করে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সেরা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ভোটারদের তাঁর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোরও সমালোচনা করেন।
সমাবেশে একের পর এক বিক্ষোভকারী ট্রাম্পের বক্তব্যে বাধা দেওয়ায় কয়েকবার তাঁর বক্তব্য থামাতে হয়। পুলিশ কয়েকজনকে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেয়। একটি ঘটনায় একজন বিক্ষোভকারীকে ট্রাম্প-সমর্থকের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়াতে দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি তাঁদের অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং কোনো প্রমাণ না দিয়েই দাবি করেন, তাঁদের কেউ কেউ দেশের শত্রুদের কাছ থেকে অর্থ পেয়ে থাকতে পারেন। এই অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সমাবেশে ইরান যুদ্ধও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ইরানের সম্ভাব্য হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোর প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তাঁর ওই বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। টেক্সাসের সমাবেশে তিনি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং ইরানের হুমকি নিয়ে কথা বলেন। হোয়াইট হাউস অবশ্য আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, ট্রাম্পের উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শহরে হামলা করার সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখা।
ট্রাম্পের জন্য টেক্সাসের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রিপাবলিকানরা দীর্ঘদিন ধরে অঙ্গরাজ্যটিকে নিরাপদ রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। কিন্তু এবার সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে ডেমোক্র্যাটরা শক্তিশালী প্রচার চালাচ্ছে। প্যাক্সটনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাই শুধু একটি সিনেট আসনের লড়াই নয়; এটি টেক্সাসে রিপাবলিকান আধিপত্য কতটা অটুট রয়েছে, তারও একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর মধ্যে টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও ট্রাম্পের সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি অন্য একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এই অনুপস্থিতি নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়েছে, যদিও তাঁর পক্ষ থেকে সমাবেশে না যাওয়ার কারণ হিসেবে আলাদা কোনো রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের জাতীয় জনপ্রিয়তাও রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদন ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। একই সময়ে নিবন্ধিত ভোটার ও স্বাধীন ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।
তবে এই পরিস্থিতিকে এখনই রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যাবে না। নির্বাচন এখনও সামনে এবং প্রচারণা, অর্থব্যয়, প্রার্থীভেদে স্থানীয় ইস্যু ও ভোটার উপস্থিতি ফলাফল বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে টেক্সাসের মতো বড় অঙ্গরাজ্যে জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় বিষয়ও ভোটের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, টেক্সাসে ট্রাম্পের সমাবেশে বিক্ষোভের ঘটনা সত্য এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। তবে এটিকে শুধু ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এর পেছনে রয়েছে ইরান যুদ্ধ, জ্বালানি মূল্য, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা, রিপাবলিকান প্রার্থীদের নির্বাচনী কৌশল এবং টেক্সাসের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভারসাম্যে সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রশ্ন।