নিউইয়র্কে হাম সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ, রাজ্যজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা গভর্নরের

নিউইয়র্কে হাম রোগের সংক্রমণ দ্রুত বাড়ায় জরুরি অবস্থা, শিশুদের টিকাদান ও স্বাস্থ্য সতর্কতায় নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

নিউইয়র্কে হাম সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ, রাজ্যজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা গভর্নরের

নিউইয়র্কে হাম সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ, রাজ্যজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা গভর্নরের


যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে হাম রোগের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় রাজ্যজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন গভর্নর ক্যাথি হোকুল। সোমবার, ৫ অক্টোবর ঘোষিত এই জরুরি ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে এবং আগামী ৪ নভেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকার কথা রয়েছে।

রাজ্য স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত নিউইয়র্কে মোট ১০৮টি হাম রোগের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯২টি ঘটনা ১৫ জুলাইয়ের পর শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বড় অংশ নিউইয়র্কের গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা এবং এসব এলাকায় টিকাদানের হার তুলনামূলকভাবে কম। মোট ১৮টি কাউন্টিতে সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।

নিউইয়র্ক সিটিতে এখন পর্যন্ত সাতটি হাম রোগের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। বাকি ১০১টি ঘটনা রাজ্যের অন্যান্য এলাকায়। অর্থাৎ সংক্রমণের বড় অংশ নিউইয়র্ক সিটির বাইরে হলেও রাজ্য সরকার বিষয়টিকে পুরো নিউইয়র্কের জন্য জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছে।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে। বিশেষ করে যারা টিকা নেননি, ছোট শিশু এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে নিউইয়র্ক সরকার হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধের জন্য ব্যবহৃত এমএমআর টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগগুলো ইতোমধ্যে আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামীণ এলাকাগুলোতে এক হাজারের বেশি এমএমআর টিকা দিয়েছে।

জরুরি অবস্থার অংশ হিসেবে নিউইয়র্ক রাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও আনা হয়েছে। এখন নিবন্ধিত নার্সরা সন্দেহভাজন হাম রোগীদের পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন। একই সঙ্গে ফার্মাসিস্টরা দুই বছর বয়সী শিশুদেরও এমএমআর টিকা দিতে পারবেন।

তবে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে শিশুদের অভিভাবকের সম্মতি প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ নতুন জরুরি ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকাদানের সুযোগ বাড়ানো হলেও বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তের অধিকার পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি।

রাজ্য সরকার টিকাদানের তথ্য দ্রুত স্বাস্থ্য রেজিস্ট্রিতে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থাও করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এমএমআর টিকা দেওয়ার তথ্য ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিউইয়র্ক রাজ্য অথবা নিউইয়র্ক সিটির টিকাদান রেজিস্ট্রিতে রিপোর্ট করতে হবে।

নিউইয়র্কের এই পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রজুড়েই ২০২৬ সালে হাম রোগের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছর দেশটিতে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ হাম রোগের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে বলে সাম্প্রতিক তথ্য জানিয়েছে। এটি ১৯৯১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে হাম সংক্রমণের সবচেয়ে খারাপ বছর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নিউইয়র্কের প্রতিবেশী পেনসিলভানিয়াতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে ৯৭৭টি হাম রোগের ঘটনা এবং পাঁচজনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছিল। পরে আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বিশেষ করে নিউইয়র্ক ও পেনসিলভানিয়ার সীমান্তবর্তী গ্রামীণ এলাকাগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষের চলাচল, স্কুল, পরিবার এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভাইরাসটি নতুন এলাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশি ও অন্যান্য অভিবাসী পরিবারের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নিউইয়র্ক সিটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ মিলিয়ন বিদেশে জন্মগ্রহণকারী মানুষ বসবাস করেন এবং শহরের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অভিবাসী। বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীও শহরের বড় বিদেশি-জন্মগ্রহণকারী জনগোষ্ঠীগুলোর একটি।

ফলে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর মধ্যে যাদের ছোট শিশু রয়েছে, তাদের জন্য সন্তানের টিকাদানের রেকর্ড হালনাগাদ রাখা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্কুলে পড়ুয়া শিশুদের ক্ষেত্রে স্কুল ও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের টিকাদান সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো যথাযথ টিকাদান। তবে কোনো পরিবারের সদস্যের হাম রোগের লক্ষণ দেখা দিলে সরাসরি ভিড়ের মধ্যে যাওয়া বা হাসপাতালের অপেক্ষাকক্ষে অন্যদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় বসে থাকার পরিবর্তে প্রথমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা নিরাপদ হতে পারে।

হাম রোগের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লালচে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে বিশেষ করে টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

নিউইয়র্ক গভর্নরের ঘোষিত জরুরি অবস্থা ৪ নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে রাজ্য সরকার আক্রান্ত এলাকাগুলোতে টিকাদান বাড়ানো, রোগ শনাক্তকরণ জোরদার করা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

নিউইয়র্কের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি স্থানীয় স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় নয়। এটি স্কুল, শিশুদের নিরাপত্তা, পরিবার, অভিবাসী কমিউনিটি এবং পুরো রাজ্যের জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আগামী কয়েক সপ্তাহে নতুন সংক্রমণের সংখ্যা এবং টিকাদানের হার পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর