কেনিয়ায় প্রথমবার ইবোলা মৃত্যু, কঙ্গোফেরত ব্যক্তির মৃত্যুতে জনমনে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা

কঙ্গো থেকে উগান্ডা হয়ে নাইরোবিতে ফেরা এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর কেনিয়ায় প্রথম ইবোলা সংক্রমণ শনাক্ত, বাড়ছে নজরদারি ও সতর্কতা জোরদার।

কেনিয়ায় প্রথমবার ইবোলা মৃত্যু, কঙ্গোফেরত ব্যক্তির মৃত্যুতে জনমনে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা

কেনিয়ায় প্রথমবার ইবোলা মৃত্যু, কঙ্গোফেরত ব্যক্তির মৃত্যুতে জনমনে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা


কেনিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী আদেন দুয়ালে জানিয়েছেন, ওই ব্যক্তি প্রায় এক মাস ধরে অসুস্থ ছিলেন। তিনি কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে অবস্থানকালে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাও নিয়েছিলেন। পরে সড়কপথে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় পৌঁছান। সেখান থেকে শনিবার একটি যাত্রীবাহী বিমানে করে নাইরোবিতে আসেন। নাইরোবির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পার হওয়ার পর স্বজনেরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে ভর্তির সময় তার জ্বর, কাঁপুনি এবং শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণের মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা যায়। দ্রুত তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয়। পরীক্ষায় ইবোলা সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পর পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয় কেনিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। 

কেনিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক প্যাট্রিক আমোথ জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ওই ব্যক্তির সংক্রমণ শনাক্ত না হওয়ার একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে ওষুধের প্রভাবে উপসর্গ সাময়িকভাবে কমে যাওয়া। ফলে তিনি বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে দেশে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। এই ঘটনার পর বিমানবন্দর ও সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 

আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে কেনিয়ায় থাকা অন্তত ২৮ জনকে শনাক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। তাদের মধ্যে পরিবারের সদস্য এবং চিকিৎসাকর্মীরাও রয়েছেন। একই বিমানে থাকা আরও ২৩ যাত্রী এবং চারজন কর্মীকেও খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট সময় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হবে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলে তাদের আলাদা রাখা হবে, যাতে ভাইরাসটি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ না পায়। 

ইবোলা সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তি বা মৃতদেহের রক্ত, বমি, মল, লালা, ঘামসহ বিভিন্ন শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত দূষিত সামগ্রীর সংস্পর্শ থেকেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। রোগটির প্রাথমিক লক্ষণের মধ্যে জ্বর, দুর্বলতা, পেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা ও গলা ব্যথা থাকতে পারে। পরে বমি, ডায়রিয়া এবং গুরুতর অবস্থায় শরীরের ভেতরে বা বাইরে রক্তক্ষরণ দেখা দিতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর পরিবর্তে সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক তরলের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাই গুরুত্বপূর্ণ।

কেনিয়ায় এই সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে কারণ এর আগে দেশটি দীর্ঘ সময় ধরে ইবোলা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছিল। চলতি বছরের জুনে কেনিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দেশটিতে তখন কোনো নিশ্চিত ইবোলা রোগী পাওয়া যায়নি। বিমানবন্দর ও স্থলসীমান্তে ব্যাপক স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালানো হচ্ছিল এবং সন্দেহভাজন বিভিন্ন ঘটনাও পরীক্ষা করা হয়েছিল। এক হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর্মীকে ইবোলা মোকাবিলায় বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত কাজ করার জন্য বিশেষজ্ঞ দল প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। 

কেনিয়ার নতুন আক্রান্ত ব্যক্তির ঘটনা বর্তমান আঞ্চলিক ইবোলা পরিস্থিতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। চলতি বছরের মে মাসে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, তখন কঙ্গোতে দুই হাজারের বেশি নিশ্চিত রোগী এবং আট শতাধিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। প্রাদুর্ভাবটির জন্য দায়ী ভাইরাসটি বিরল বান্দিবুগিও ধরনের ইবোলা। 

এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত নজরদারি, দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের অনুসরণ এবং আক্রান্তদের আলাদা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গো ও উগান্ডায় এই প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় নজরদারি, রোগী শনাক্তকরণ, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছিল। 

উগান্ডায় চলতি বছরে ইবোলার ২০টি নিশ্চিত সংক্রমণ এবং দুটি মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। পরে আগস্টে দেশটি ইবোলামুক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কঙ্গো থেকে আক্রান্ত ব্যক্তি উগান্ডা হয়ে কেনিয়ায় পৌঁছানোর ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, সীমান্ত অতিক্রম করে মানুষের চলাচল সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। 

কেনিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখন আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা প্রত্যেককে শনাক্ত করার পাশাপাশি একই বিমানে থাকা যাত্রী ও কর্মীদের খুঁজছে। মৃত ব্যক্তির দাফনও সংক্রমণ প্রতিরোধের বিশেষ নিরাপত্তাবিধি মেনে সম্পন্ন করার কথা জানানো হয়েছে। ইবোলায় মৃত ব্যক্তির দেহ থেকেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় দাফনের সময় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন হয়। 

কেনিয়ায় প্রথম ইবোলা সংক্রমণ ও প্রথম মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হওয়া সত্য। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি কঙ্গো থেকে আমদানি করা একটি সংক্রমণ। কেনিয়ার ভেতরে ব্যাপকভাবে রোগ ছড়িয়ে পড়েছে এমন কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। বরং কর্তৃপক্ষ দ্রুত সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে পর্যবেক্ষণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এটিকে ইতোমধ্যে ব্যাপক মহামারি হিসেবে বর্ণনা করা ঠিক হবে না। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর