ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা উদ্যোগে রূপা হকের সাক্ষাৎ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা উদ্যোগ নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য রূপা হকের সঙ্গে সাক্ষাতে সম্ভাবনা ও আলোচনা

ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা উদ্যোগে রূপা হকের সাক্ষাৎ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা উদ্যোগে রূপা হকের সাক্ষাৎ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা


নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য ও লেবার পার্টির রাজনীতিক রূপা হকের সাক্ষাৎ হয়েছে। সোমবার, ৫ অক্টোবর, ঢাকার মিরপুরে ইউনূস সেন্টারে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব শেষ করার পর সামাজিক ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও উদ্যোক্তা তৈরির বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়। সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনেও সাক্ষাতের সময়, স্থান এবং আলোচনার বিষয়গুলো একইভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

যুক্তরাজ্যের সরকারি পার্লামেন্টারি তথ্য অনুযায়ী, রূপা হক বর্তমানে ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনের নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্য এবং লেবার পার্টির সদস্য। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি ওই আসনে ২২ হাজার ৩৪০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। পার্লামেন্টের তথ্যেও তার বর্তমান দলীয় পরিচয় লেবার পার্টি এবং ২০২৪ সাল থেকে বর্তমান মেয়াদে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। 

সাক্ষাতে অধ্যাপক ইউনূস গ্রামীণ পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সম্পর্কে রূপা হককে অবহিত করেন। এর মধ্যে রয়েছে চক্ষু চিকিৎসাকেন্দ্র, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, নার্সিং শিক্ষা এবং বৃহৎ হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ইউনূস সেন্টারের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানটির চারটি চক্ষু হাসপাতাল বর্তমানে বগুড়া, বরিশাল, ঠাকুরগাঁও ও সাতক্ষীরায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। রাজশাহীতে আরও একটি চক্ষু হাসপাতাল চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। 

গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৩২ লাখের বেশি রোগী সেবা পেয়েছেন। তাদের একটি বড় অংশ বিনা মূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে চিকিৎসা পেয়েছেন। একই সঙ্গে দুই লাখের বেশি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়ার তথ্যও প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দৃষ্টিসেবা কেন্দ্র পরিচালনার পাশাপাশি নার্স তৈরির জন্য গ্রামীণ ক্যালেডোনিয়ান নার্সিং কলেজও কার্যক্রম চালাচ্ছে। 

বৈঠকে আলোচনায় আসে সাতশ শয্যার একটি সামাজিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনাও। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দিয়াবাড়ি এলাকায় নার্সিং কলেজের কাছাকাছি এলাকায় সাতশ শয্যার হাসপাতাল, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও স্বাস্থ্য গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগকে সামাজিক ব্যবসার ধারণার সঙ্গে যুক্ত করে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যেখানে দরিদ্র মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য হবে। 

রূপা হকের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সুখী পরিদর্শন। বৈঠকের পর তিনি সুখী ও ইউনূস সেন্টারের কার্যালয় ঘুরে দেখেন এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে উপস্থাপনা শোনেন। সুখীর নিজস্ব প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি অনলাইনে চিকিৎসকের পরামর্শ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, বাড়িতে রোগ নির্ণয় পরীক্ষা, ওষুধ সরবরাহ, সেবাযত্নকারী সেবা, অ্যাম্বুলেন্স ও রক্তের সন্ধানসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত। 

সুখীর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তাদের সেবাগ্রহীতার সংখ্যা ৩৪ লাখের বেশি এবং দেশের ৬৪ জেলায় তাদের সেবা কার্যক্রম বিস্তৃত। তবে সুখীকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করার দাবিটি মূলত প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব পরিচিতি; স্বাধীনভাবে যাচাই করা বাজারভিত্তিক তুলনামূলক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তাই প্রতিবেদনে এটিকে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে, নিশ্চিত স্বাধীন পরিসংখ্যান হিসেবে নয়। 

আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়। অধ্যাপক ইউনূস রূপা হককে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি সম্পর্কে জানান। বিশ্ববিদ্যালয়টির মূল লক্ষ্য প্রচলিত অর্থে শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করা নয়, বরং উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী তরুণ তৈরি করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা তৈরি, উদ্ভাবন এবং বাস্তব সামাজিক সমস্যার সমাধানে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। 

গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের পেছনে অধ্যাপক ইউনূসের তিন শূন্যের ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য শূন্যে নামিয়ে আনা, বেকারত্ব শূন্যে নামিয়ে আনা এবং নিট কার্বন নিঃসরণ শূন্যের দিকে নিয়ে যাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যানের বক্তব্যেও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে উদ্যোক্তা তৈরির ধারণা থাকবে। 

বিশ্ববিদ্যালয়টির অগ্রগতির বিষয়েও সাম্প্রতিক তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের মার্চে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং একই বছরের এপ্রিলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদনের পর একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৩৩ একর জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলার কাজও চলমান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। 

সাক্ষাতে অধ্যাপক এম এ ফার্মার, যুক্তরাজ্যের স্থানীয় রাজনীতিক ও হিসাববিদ ওহিদ আহমেদ এবং ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন। ওহিদ আহমেদের স্থানীয় রাজনৈতিক দায়িত্বের বিষয়ে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নথিতে তার উপমেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের তথ্য পাওয়া যায়। ২০১০ সালে তাকে উপমেয়র হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং ২০১৪ সালেও কাউন্সিলের নথিতে তাকে ওই পদে দেখা যায়। 

এই সফরটি রূপা হকের বাংলাদেশ সফরের ধারাবাহিকতারও অংশ। এর এক দিন আগে, ৪ অক্টোবর, তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন এবং সেখানে প্রদর্শিত বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে খোঁজ নেন। এর আগে তিনি অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বৈঠক করেছেন। তবে এবারের ইউনূস সেন্টারের বৈঠকে মূল আলোচনার কেন্দ্র ছিল সামাজিক ব্যবসা ও এর সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা উদ্যোগ। 

তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, রূপা হকের সঙ্গে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ৫ অক্টোবরের সাক্ষাৎ, আলোচনার বিষয়, সুখী পরিদর্শন এবং গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনা এসব তথ্য একাধিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। স্বাস্থ্যসেবা, চক্ষু হাসপাতাল, নার্সিং কলেজ এবং সাতশ শয্যার হাসপাতাল প্রকল্পের বিষয়ে গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্যও মূল দাবিগুলোকে সমর্থন করে। তবে সুখীকে দেশের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বলা এবং কয়েকটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা সম্পর্কিত তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দাবি; সেগুলোর স্বাধীন তুলনামূলক যাচাই সীমিত। ফলে সামগ্রিকভাবে সংবাদটির মূল ঘটনা সত্য ও সমর্থিত, তবে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রচারমূলক পরিসংখ্যানগুলোকে দাবি হিসেবে উপস্থাপন করাই তথ্যনির্ভর পদ্ধতি। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর