বিদেশি অনুদান কমলে এনজিওকে সরকারি কাজে যুক্ত করবে সরকার
বিদেশি অনুদানের নির্ভরতা কমিয়ে সরকারি সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এনজিওর অংশগ্রহণ বাড়াতে নতুন নীতিকাঠামো তৈরির উদ্যোগ।
বিদেশি অনুদান কমলে এনজিওকে সরকারি কাজে যুক্ত করবে সরকার
রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে বিদেশি অনুদানের ওপর এনজিওগুলোর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস ও সরকারি কার্যক্রমের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আয়োজিত ‘বিদেশি নির্ভরতার বাইরে: বাংলাদেশে এনজিও অর্থায়নের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মকাণ্ডে এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো হবে। এ জন্য একটি নীতিকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে এনজিওগুলো কাজ করলে দেশের উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
সেমিনারে এনজিও খাতের অর্থায়ন নিয়ে যে চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়, তার অন্যতম কারণ বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তার পরিবর্তিত পরিস্থিতি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সহায়তার অর্থায়নে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের সংকোচন দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক চাপ, বিভিন্ন দেশে বাজেট সংকোচন, যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দাতাদেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তার অর্থ কমছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা প্রকৃত হিসাবে ২৩ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে, যা এ সহায়তার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন।
সংস্থাটির ২০২৬ সালের পূর্বাভাসও উদ্বেগজনক। চলতি বছরে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা আরও ৬ দশমিক ৯ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর ফলে টানা তৃতীয় বছর বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তা কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র দেশ, স্বাস্থ্য, মানবিক সহায়তা এবং নাগরিক সমাজভিত্তিক কর্মকাণ্ডে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিন্ন দিক রয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত সরকারি তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে কর্মরত এনজিওগুলোর মাধ্যমে পাওয়া বিদেশি অনুদানের পরিমাণ প্রায় ৮৩৮ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি এবং সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে এনজিওগুলোর মাধ্যমে নতুন অনুদানের প্রতিশ্রুতিও ৪৪ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১১৫ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
এ কারণে বাংলাদেশের এনজিও খাতের বর্তমান বাস্তবতাকে শুধু ‘বিদেশি অনুদান কমে যাচ্ছে’ বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং বৈশ্বিক পর্যায়ে অনুদান কমে যাওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের এনজিওগুলোর অর্থায়নে চাপ সৃষ্টি করতে পারে—এই আশঙ্কাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অর্থায়ন বাড়লেও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনায় বিকল্প অর্থের উৎস তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এনজিওগুলোর ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্ষুদ্রঋণ, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে এনজিওগুলো দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
কিন্তু বিদেশি অনুদাননির্ভরতার কারণে অর্থায়নের উৎসে বৈচিত্র্য না থাকলে দাতাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলো বড় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়নের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরশীল। ফলে বিদেশি সহায়তা কমে গেলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা, কর্মী ধরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ অবস্থায় সরকারি অর্থায়নের আওতায় এনজিওদের অংশগ্রহণ বাড়ানো একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে। সামাজিক সেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তা, নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কর্মসূচিতে সরকারের সঙ্গে এনজিওগুলোর অংশীদারত্ব বাড়ানো হলে একই অর্থ দিয়ে আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় যোগ্য এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এ ধরনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন এবং কাজের মান যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। শুধু সরকারি অর্থ এনজিওগুলোর কাছে হস্তান্তর করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না; অর্থের সঠিক ব্যবহার ও প্রকল্পের ফলাফল নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
একই সঙ্গে এনজিওগুলোর নিজেদের অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদান সংগ্রহ, সামাজিক উদ্যোগ, দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক সহায়তা, সেবাভিত্তিক আয় এবং স্থানীয় অংশীদারত্বের মাধ্যমে অর্থের নতুন উৎস তৈরি করা যেতে পারে। এতে বিদেশি দাতার ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন সহায়তা কমার প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা হলেও দেশীয় এনজিও অর্থায়নের বর্তমান তথ্য দেখাচ্ছে, পরিস্থিতি এখনই সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছেনি। বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর ঘোষিত নীতিকাঠামো বাস্তবায়িত হলে এনজিওগুলোর জন্য অর্থায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এনজিওগুলোর দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানো সম্ভব হবে। তবে এই অংশীদারত্ব সফল করতে হলে সরকারি সংস্থা ও এনজিও উভয় পক্ষের দায়িত্ব, অর্থ ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহির কাঠামো স্পষ্ট করতে হবে।
খবরটির মূল বক্তব্যের ভিত্তি রয়েছে; তবে ‘বাংলাদেশের এনজিওগুলোর বিদেশি অনুদান কমে গেছে’ এমন সরাসরি দাবি তথ্য দিয়ে সমর্থিত নয়। বরং যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অর্থবছরে বিদেশি অনুদান বেড়েছে। প্রকৃত পরিবর্তন হলো বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়ার প্রবণতা, যার ভবিষ্যৎ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ এনজিও অর্থায়নের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করতে চাইছে।