কঙ্গো নদীতে দুই নৌকার সংঘর্ষ, প্রাণ গেল অন্তত ৩০ জন, নিখোঁজ বহু যাত্রী

কঙ্গো নদীতে দুই নৌকার সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ রয়েছেন আরও বহু যাত্রী, উদ্ধার তৎপরতা চলছে, বাড়ছে দেশজুড়ে শোক।

কঙ্গো নদীতে দুই নৌকার সংঘর্ষ, প্রাণ গেল অন্তত ৩০ জন, নিখোঁজ বহু যাত্রী

কঙ্গো নদীতে দুই নৌকার সংঘর্ষ, প্রাণ গেল অন্তত ৩০ জন, নিখোঁজ বহু যাত্রী


গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমাঞ্চলে কঙ্গো নদীতে ভয়াবহ নৌদুর্ঘটনায় অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় আরও বহু যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন। নদীপথে চলাচলকারী দুটি নৌযানের সংঘর্ষের পর একটি নৌযান ডুবে গেলে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দা, নিরাপত্তাকর্মী ও উদ্ধারকারী দল নিখোঁজদের সন্ধানে তৎপরতা শুরু করে। তবে নদীর গভীরতা এবং দুর্ঘটনাস্থলের দুর্গম অবস্থানের কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে। 

দুর্ঘটনাটি দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় একুয়াতর প্রদেশের লুকোলেলা এলাকার কাছে এনগোম্বে অঞ্চলে ঘটে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রাতের নদীপথে চলার সময় দুটি নৌযানের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। একটি নৌযান উবাঙ্গি অঞ্চল থেকে রাজধানী কিনশাসার দিকে যাচ্ছিল। অন্য নৌযানটি কিনশাসা থেকে লুকোলেলার দিকে যাচ্ছিল। সংঘর্ষের পর যাত্রীবাহী নৌযানটি পানিতে ডুবে যায়। 

স্থানীয় প্রাদেশিক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিসপিন মপুতুর বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে তিনি জানিয়েছেন, রাতে নদীতে নৌযান চলাচলের কারণে অতীতে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন নিরাপত্তাকর্মী জানিয়েছেন, উবাঙ্গি থেকে আসা নৌযানটিতে বিপুল পরিমাণ পণ্য ছিল এবং সেটি অতিরিক্ত বোঝাই হয়ে থাকতে পারে। সংঘর্ষের পর নৌযানটি দ্রুত ডুবে যায় এবং অনেক যাত্রী পানির নিচে আটকা পড়েন বলে ওই প্রত্যক্ষদর্শী জানান। 

দুর্ঘটনার প্রাথমিক হিসাব নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। রয়টার্স প্রথমে জানায়, ডুবে যাওয়া যাত্রীবাহী নৌযানে ১৬৩ জন যাত্রী ছিলেন। ওই সময় ২২টি মরদেহ উদ্ধার এবং ৫৯ জনকে জীবিত উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। ডুবে যাওয়া নৌযানটি প্রায় ১২ মিটার গভীরে রয়েছে বলেও জানানো হয়। পরে স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এপি জানায়, নিহতের সংখ্যা অন্তত ৩০ জন এবং আরও কয়েক ডজন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

স্থানীয় সরকারি তথ্যেও দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ ও নিহতের সংখ্যা পরিবর্তিত হওয়ার কথা উঠে এসেছে। একুয়াতর প্রদেশের সরকারি সংবাদ সংস্থা প্রাথমিকভাবে কয়েকজন নিহত ও বহু নিখোঁজের কথা জানিয়েছিল এবং ৫৭ জন জীবিত উদ্ধারের তথ্য দিয়েছিল। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি ধাতব নৌযানের সঙ্গে কাঠের নৌযানের সংঘর্ষের পর কাঠের নৌযানটি ডুবে যায়। রাতে চলাচল এবং নৌযানগুলোর দৃশ্যমানতা-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতাকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

এই দুর্ঘটনা কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের নদীপথে যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ আবার সামনে এনেছে। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ দুর্বল হওয়ায় নদীপথই বহু মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের জন্য নৌযান অনেক সময় একমাত্র কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা। ফলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ নদীপথে চলাচল করেন। কিন্তু অনেক নৌযান পুরোনো, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বহন করে এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকে না বলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। 

রাতের অন্ধকারে নৌযান চলাচল পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। নদীর বিস্তৃত জলরাশি, স্রোত, পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং নৌযানগুলোর মধ্যে কার্যকর সংকেতব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে একে অপরকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। সর্বশেষ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও রাতের চলাচল গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে বলে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংঘর্ষের নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাচ্ছে না। 

দুর্ঘটনার পর নদীতে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। নিখোঁজ যাত্রীদের সন্ধানে স্থানীয়ভাবে তল্লাশি চালানো হচ্ছে এবং পানির নিচে থাকা নৌযান থেকে আরও মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। উদ্ধারকারীদের জন্য নদীর গভীরতা ও দুর্গম পরিবেশ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ফলে বর্তমানে প্রকাশিত সংখ্যাকে প্রাথমিক হিসাব হিসেবেই দেখা হচ্ছে। 

কঙ্গো নদীতে এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও দেশটির বিভিন্ন নদী ও হ্রদে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, দুর্বল নৌযান, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং রাতের যাত্রার কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরও দেশটির কাসাই প্রদেশে শিক্ষার্থীদের বহনকারী একটি কাঠের নৌযান ডুবে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এসব ঘটনার পর নদীপথে যাত্রী পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নৌযান চলাচলে কঠোর নজরদারির দাবি নতুন করে জোরালো হচ্ছে। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর