ফ্লোরিডায় সকালে ভয়াবহ স্কুলবাস দুর্ঘটনায় দুইজন নিহত, নিহতদের একজন দশম শ্রেণির ছাত্রী

ফ্লোরিডার উইন্টার হ্যাভেনে ভয়াবহ স্কুলবাস দুর্ঘটনায় দুইজন নিহত, আহত বহু শিক্ষার্থী; তদন্তে উঠে আসছে দুর্ঘটনার নতুন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে উদ্বেগ

ফ্লোরিডায় সকালে ভয়াবহ স্কুলবাস দুর্ঘটনায় দুইজন নিহত, নিহতদের একজন দশম শ্রেণির ছাত্রী
ফ্লোরিডায় সকালে ভয়াবহ স্কুলবাস দুর্ঘটনায় দুইজন নিহত, নিহতদের একজন দশম শ্রেণির ছাত্রী

ফ্লোরিডার উইন্টার হ্যাভেনে সোমবার সকালে ভয়াবহ এক বহুযান সড়ক দুর্ঘটনায় একটি স্কুলবাস উল্টে গিয়ে দুইজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের একজন উইন্টার হ্যাভেন উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক ছাত্রী। অন্যজন ছিলেন একটি রুপালি জিপ গাড়ির চালক। দুর্ঘটনায় আরও বহু শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন এবং তাদের কয়েকজনকে গুরুতর আঘাতের আশঙ্কায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। অন্তত একজন আহতের অবস্থা সংকটজনক বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। 


দুর্ঘটনাটি ঘটে স্থানীয় সময় সোমবার ৫ অক্টোবর সকাল প্রায় ৬টা ১৩ মিনিটে উইন্টার হ্যাভেনের লুসার্ন পার্ক সড়কে। ওই সময় একটি স্কুলবাস পূর্বদিকে যাচ্ছিল। বাসটিতে মোট ৩৯ জন ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ৩৭ জন উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বাসচালক এবং চালকের নয় বছর বয়সী মেয়ে। বাসটি শিক্ষার্থীদের উইন্টার হ্যাভেন উচ্চবিদ্যালয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। 


পোল্ক কাউন্টির শেরিফ গ্র্যাডি জাডের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বিপরীত দিক থেকে আসা একটি সাদা গাড়ি হঠাৎ সড়কের মাঝের হলুদ রেখা অতিক্রম করে স্কুলবাসের দিকে চলে আসে। গাড়িটি বাসের পেছনের দিকের চাকার কাছে আঘাত করে। প্রচণ্ড ধাক্কায় বাসের একটি পেছনের চাকা খুলে যায় এবং বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপরীত দিকের লেনে চলে যায়। এরপর বাসটি একটি রুপালি জিপ গাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের পর বাসটি সড়কের পাশের খাদে গিয়ে উল্টে ছাদের ওপর পড়ে যায়। জিপ গাড়িটিতে আগুন ধরে যায় এবং এর চালক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। 


প্রাথমিক তদন্তে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িটি কেন সড়কের মাঝের রেখা অতিক্রম করেছিল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ওই গাড়ির চালক দুর্ঘটনার পর তদন্তকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগও আনা হয়নি। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত চলছে। 


দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই বেশি ছিল যে ঘটনাস্থলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক জরুরি বিভাগের কর্মী ছুটে যান। পোল্ক কাউন্টির শেরিফের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শতাধিক উদ্ধারকর্মী ও জরুরি বিভাগের সদস্য দুর্ঘটনাস্থলে কাজ করেন। আহতদের দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠাতে একাধিক উড়োজাহাজ ও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হয়। কয়েকজন গুরুতর আহতকে আকাশপথে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। 


আহত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। প্রাথমিক সংবাদ সম্মেলনে শেরিফ জানিয়েছিলেন, পাঁচ থেকে সাতজনকে গুরুতর আঘাতের আশঙ্কায় বিশেষ জরুরি রোগী হিসেবে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং অন্তত একজনের অবস্থা সংকটজনক ছিল। পরবর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুলবাসে থাকা প্রায় ২৬ জন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্যের তুলনায় পরে হাসপাতালে নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বেশি বলে জানা যায়। 


দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আহত শিক্ষার্থীদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিরাপদে মিলিয়ে দেওয়া। উদ্ধারকর্মীরা প্রথম কয়েক ঘণ্টা ধরে আহতদের হাসপাতালে পাঠানো, শিক্ষার্থীদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং তাদের বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। স্কুল কর্তৃপক্ষও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। 


দুর্ঘটনায় নিহত দশম শ্রেণির ছাত্রীকে ঘিরে উইন্টার হ্যাভেন উচ্চবিদ্যালয় এলাকায় গভীর শোক নেমে এসেছে। স্কুলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক এবং শোক তৈরি হয়েছে। পোল্ক কাউন্টি স্কুল বোর্ডের চেয়ারম্যান জাস্টিন শার্পলেস নিহত ছাত্রীর পরিবার, বিদ্যালয় এবং শিক্ষক-কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য স্থানীয় জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, একজন তরুণকে হারানোর কষ্ট দূর করার মতো কোনো শব্দ নেই। 


পোল্ক কাউন্টির স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের নিয়মিতভাবে বাস দুর্ঘটনার সময় কীভাবে দ্রুত বাস থেকে বের হতে হবে, সে বিষয়ে অনুশীলন করানো হয়। স্কুলের শিক্ষা কর্মকর্তা ফ্রেডেরিক হেইড বলেন, শিক্ষার্থীদের এসব অনুশীলন দুর্ঘটনার সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তার মতে, বাসটির অবস্থার দিকে তাকালে বোঝা যায় দুর্ঘটনাটি আরও ভয়াবহ হতে পারত। 


পোল্ক কাউন্টির শেরিফ গ্র্যাডি জাড এই দুর্ঘটনাকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ স্কুলবাস দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একটি তরুণ প্রাণের মৃত্যু পুরো সম্প্রদায়ের জন্য গভীর ক্ষতি। দুর্ঘটনার দৃশ্যও ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে বাসটিকে উল্টে থাকা অবস্থায় দেখতে পান এবং বাসটির সামনের অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 


দুর্ঘটনার পর লুসার্ন পার্ক সড়কের একটি বড় অংশ দুই দিক থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুরোনো লুসার্ন পার্ক সড়ক থেকে ওয়ালমার্টের পণ্য বিতরণকেন্দ্র পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ ছিল। তদন্তকারী দল দুর্ঘটনাস্থলে প্রমাণ সংগ্রহ এবং গাড়িগুলোর অবস্থান পরীক্ষা করে। চালকদের বিকল্প পথ ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়। 


এই দুর্ঘটনার তদন্ত করছে পোল্ক কাউন্টির শেরিফের কার্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা ও হত্যাকাণ্ড তদন্তকারী দল। তদন্তকারীরা কোন পরিস্থিতিতে সাদা গাড়িটি সড়কের মাঝের রেখা অতিক্রম করেছিল, সংঘর্ষের আগে গাড়িটির গতি কত ছিল এবং বাসে আঘাতের পর কীভাবে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, তা খতিয়ে দেখছেন। দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনগুলোর ক্ষয়ক্ষতি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণও তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। 


উল্লেখযোগ্যভাবে, মাত্র এক মাসের কিছু বেশি সময় আগে পোল্ক কাউন্টিতে আরেকটি স্কুলবাস দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছিল। ৩ সেপ্টেম্বর লেকল্যান্ড এলাকায় একটি স্কুলবাস দুর্ঘটনায় জড়িয়েছিল। তবে ওই সময় বাসটিতে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না এবং আহত ব্যক্তির আঘাত প্রাণঘাতী ছিল না। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর নতুন এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় একজন শিক্ষার্থীসহ দুইজনের মৃত্যু স্থানীয়ভাবে স্কুলবাস নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। 


তবে বর্তমান দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এখনো কোনো পক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী ঘোষণা করা হয়নি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ বা সম্ভাব্য দায় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে সাদা গাড়িটি কেন বিপরীত লেনে চলে গিয়েছিল, সেটিই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে আছে। পুলিশ ও শেরিফের কার্যালয় তদন্ত শেষ হওয়ার পর আরও তথ্য প্রকাশ করবে বলে জানিয়েছে। 


প্রতিবেদক

CSB News USA

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…