যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি ছোট নৌকায় আসা প্রায় সব নারী পথে ধর্ষণের শিকার
যুক্তরাজ্যে ছোট নৌকায় আসা নারীদের যাত্রাপথে যৌন সহিংসতার ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তবে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি ছোট নৌকায় আসা প্রায় সব নারী পথে ধর্ষণের শিকার
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের একটি বিস্ফোরক মন্তব্যকে ঘিরে দেশটির অভিবাসননীতি, মানব পাচার এবং ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। মাহমুদ বলেছেন, উত্তর ফ্রান্সে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার জন্য ছোট নৌকায় ওঠার অপেক্ষায় থাকা প্রায় প্রতিটি নারীই যাত্রাপথে ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। তবে তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, তাঁর বক্তব্যটি একটি গুরুতর সতর্কতা ও ব্যক্তিগত মূল্যায়ন; এটিকে এখন পর্যন্ত সরকারি পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
মাহমুদ এই মন্তব্য করেন গত ৪ অক্টোবর প্রচারিত একটি রাজনৈতিক আলোচনামূলক অনুষ্ঠানে। সেখানে তিনি বলেন, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ উত্তর ফ্রান্সে পৌঁছানো এবং সেখান থেকে ছোট নৌকায় ওঠার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর ফ্রান্সে কারা জড়ো হবে এবং কারা নৌকায় উঠবে, সেই বাছাইয়ের বড় অংশই অপরাধী চক্র ও মানব পাচারকারীদের হাতে চলে যায়। তিনি দাবি করেন, এই অবস্থায় নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অত্যন্ত বড় ঝুঁকিতে থাকেন এবং কিছু পুরুষও নির্যাতন ও হুমকির মুখে পড়েন।
মাহমুদের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো তাঁর প্রায় নিশ্চিত করে দেওয়ার মতো মন্তব্য। তিনি উত্তর ফ্রান্সে নৌকায় ওঠার অপেক্ষায় থাকা নারীদের প্রসঙ্গে ধর্ষণের আশঙ্কার কথা বলেন। এখানেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি আরও বড় আকার নেয়। বিভিন্ন পক্ষ তাঁর বক্তব্যকে এমনভাবে প্রচার করছে যেন যুক্তরাজ্যে ছোট নৌকায় প্রবেশ করা প্রায় প্রতিটি নারী নিশ্চিতভাবেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। কিন্তু মূল বক্তব্যের সঙ্গে এই উপস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
মূল বক্তব্যে মাহমুদ উত্তর ফ্রান্সে অবস্থানরত এবং নৌকায় ওঠার অপেক্ষায় থাকা নারীদের কথা বলেছেন। তিনি যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো প্রত্যেক নারী সম্পর্কে কোনো সরকারি জরিপের ফল প্রকাশ করেননি। তাঁর বক্তব্যে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা, জরিপ, তদন্ত প্রতিবেদন বা আক্রান্ত নারীদের শতকরা হারও দেওয়া হয়নি। ফলে “প্রায় সব নারী ধর্ষণের শিকার” কথাটিকে সরকারি পরিসংখ্যানভিত্তিক চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রচার করা সঠিক হবে না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পথে যৌন সহিংসতা বা মানব পাচারের ঘটনা নেই। বরং ব্রিটিশ সরকারের নিজস্ব পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, এই পথে আসা অনেক মানুষ মানব পাচার ও আধুনিক দাসত্বের মতো অপরাধের ঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো প্রায় এক লাখ ৮৭ হাজার ৭৭৮ জনের মধ্যে ২৬ হাজার ৩৮৩ জনকে সম্ভাব্য আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে সরকারি সহায়তা ব্যবস্থায় পাঠানো হয়েছিল। অর্থাৎ মোট আগমনকারীদের প্রায় ১৪ শতাংশকে এমন ঝুঁকির সম্ভাব্য ভুক্তভোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে এই হার প্রায় ১৯ শতাংশে উঠেছিল।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক দাসত্বের মধ্যে মানব পাচার, জোরপূর্বক শ্রম, দাসত্ব এবং বিভিন্ন ধরনের শোষণ অন্তর্ভুক্ত। তাই ছোট নৌকায় আসা মানুষের সবাই একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। একইভাবে শুধু এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেও বলা যায় না যে ওই নারীদের প্রায় সবাই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যৌন সহিংসতার নির্দিষ্ট হার জানতে আলাদা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ছোট নৌকায় আসা মানুষের বড় অংশ পুরুষ। যুক্তরাজ্যের সংসদীয় গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরের হিসাবে ছোট নৌকায় আসা মানুষের প্রায় ৭২ শতাংশ ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, প্রায় ১৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী এবং প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু। একই সময়ে মোট প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ এই পথে যুক্তরাজ্যে পৌঁছান।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ছোট নৌকায় ৩৩ হাজার ৩৭৪ জন যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছিলেন। আগের এক বছরের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ২৩ শতাংশ কম। তবুও সরকার এটিকে বড় সীমান্ত ও নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখছে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকেও ছোট নৌকায় আগমন অব্যাহত ছিল। ব্রিটিশ সরকারের সাম্প্রতিক দৈনিক হিসাবে ২৭ সেপ্টেম্বর ৫২৬ জন সাতটি নৌকায় এবং ২৯ সেপ্টেম্বর আরও ৬১ জন একটি নৌকায় পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। এসব সংখ্যা প্রাথমিক এবং পরে পরিবর্তিত হতে পারে।
মাহমুদের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানব পাচারকারী চক্র। তিনি মনে করেন, অপরাধী চক্র মানুষের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে তাদের উত্তর ফ্রান্সে জড়ো করে এবং বিপজ্জনক নৌযানে করে ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার ব্যবস্থা করে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় নারীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারেন। যাত্রাপথে আগে থেকেই যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া, জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ, হুমকি এবং শোষণের মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
যুক্তরাজ্য সরকার বর্তমানে এই মানব পাচারকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে। সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে সংগঠিত অভিবাসন অপরাধ মোকাবিলায় নিয়োজিত জাতীয় অপরাধ সংস্থার কর্মকর্তার সংখ্যা ৩৭৬ থেকে বেড়ে প্রায় ৮০০ হয়েছে। সরকার বলছে, ছোট নৌকার পেছনে থাকা অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তৎপরতা, গ্রেপ্তার এবং সরঞ্জাম জব্দের কাজও বাড়ানো হয়েছে।
ফ্রান্সের সঙ্গেও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে কাজ করছে। ব্রিটিশ সরকারের হিসাবে, ২৭ এপ্রিল থেকে ২ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ফরাসি কর্তৃপক্ষ ১৮৫টি ছোট নৌকা পারাপারের চেষ্টা ঠেকিয়েছে। এসব অভিযানে নৌকা, ইঞ্জিন ও জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে এবং পাচারকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার বলছে, ওই সময়ে প্রায় ৬১ শতাংশ সম্ভাব্য পারাপারের ঘটনা প্রতিরোধ করা হয়েছিল।
তবে এই কঠোর নীতির পাশাপাশি মাহমুদ নিরাপদ ও বৈধ পথে শরণার্থীদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর কথাও বলেছেন। ব্রিটিশ সরকারের জুন মাসের ঘোষণায় বলা হয়েছিল, নতুন নিরাপদ ও বৈধ শরণার্থী পথ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো, বৈধ পথ বাড়ানো গেলে যুদ্ধ, নিপীড়ন ও নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা মানুষকে পাচারকারীদের হাতে পড়া ছাড়াই নিরাপদভাবে যুক্তরাজ্যে আসার সুযোগ দেওয়া যাবে।
শরণার্থী অধিকারকর্মীরাও মাহমুদের বক্তব্যের একটি অংশকে সমর্থন করেছেন। শরণার্থী পরিষদের পরিচালক ইমরান হুসেইন বলেছেন, যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালানো নারী ও শিশুরা যাত্রাপথে যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তবে তাঁর বক্তব্য হলো, এই ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ ও বৈধ পথ আরও বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে মানুষ মানব পাচারকারীদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য না হয়।
এদিকে যুক্তরাজ্যের ছোট নৌকা সমস্যা এখন দেশটির অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে। সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার কথা বলছে, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো আরও কঠোর পদক্ষেপ দাবি করছে এবং শরণার্থী অধিকারকর্মীরা নিরাপদ প্রবেশপথ বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন। ফলে বিষয়টি শুধু অভিবাসন নয়, সীমান্ত নিরাপত্তা, মানব পাচার, নারী নিরাপত্তা এবং মানবিক দায়িত্বের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ছোট নৌকায় আসা নারীদের যৌন সহিংসতার ঝুঁকি নিয়ে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য সত্যিই করা হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে অভিবাসন ঠেকানোর কারণে ধর্ষণ বা হত্যার নির্দিষ্ট কত ঘটনা বন্ধ হয়েছে, এমন কোনো তুলনামূলক সরকারি পরিসংখ্যান এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তনীতি এই নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান করেছে বলে নিশ্চিত দাবি করা তথ্যভিত্তিক হবে না।
সব মিলিয়ে তথ্য যাচাইয়ের ফল হলো, যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ সত্যিই বলেছেন যে উত্তর ফ্রান্সে ছোট নৌকায় ওঠার অপেক্ষায় থাকা প্রায় প্রতিটি নারী যাত্রাপথে ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। এই বক্তব্যের মূল উৎসও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এটিকে “যুক্তরাজ্যে ছোট নৌকায় আসা প্রায় প্রতিটি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন”—এমন প্রমাণিত সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। কারণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য সরকারি তথ্যে এমন কোনো নির্দিষ্ট হার নেই। নিশ্চিতভাবে যা বলা যায়, তা হলো ছোট নৌকায় যাত্রা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, মানব পাচার ও শোষণের আশঙ্কা বাস্তব, এবং নারী ও শিশুরা বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারেন।