নিউ জার্সিতে ওয়েস্ট নাইলে প্রথম মৃত্যু, আক্রান্ত ২৬, সতর্ক স্বাস্থ্য বিভাগ
নিউ জার্সিতে ২০২৬ সালে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে প্রথম মৃত্যুর খবর এসেছে। একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে পৌঁছেছে। মশাবাহিত এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
নিউ জার্সিতে ওয়েস্ট নাইলে প্রথম মৃত্যু, আক্রান্ত ২৬, সতর্ক স্বাস্থ্য বিভাগ
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে ২০২৬ সালে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করেছে রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ। একই সময়ে রাজ্যজুড়ে ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে পৌঁছেছে। মশাবাহিত এই রোগের কার্যক্রম সাম্প্রতিক সময়ে বাড়তে থাকায় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে নিউ জার্সি কর্তৃপক্ষ।
নিউ জার্সি স্বাস্থ্য বিভাগের ২ অক্টোবরের ঘোষণায় বলা হয়েছে, এ বছর এখন পর্যন্ত ২৬ জনের ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে এবং তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের ১৯ জনের ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্ত্রের গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে। আক্রান্তদের ৬৯ শতাংশের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি।
মৃত ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তবে স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি দক্ষিণ নিউ জার্সির বাসিন্দা এবং বয়স ৬০ বছরের বেশি ছিল। স্বাস্থ্য বিভাগও ব্যক্তির পরিচয় ও বিস্তারিত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করেনি।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন, শরৎকাল শুরু হলেও মশার ঝুঁকি শেষ হয়ে যায়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে নিউ জার্সিতে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস বহনকারী মশার উপস্থিতি ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় বেশি পাওয়া যাচ্ছে। রাজ্যের ২১টি কাউন্টিতেই মশার নমুনায় এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
রাজ্যের সর্বশেষ নজরদারি তথ্যে দেখা গেছে, ১ হাজার ১৮২টি মশার নমুনায় ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস পাওয়া গেছে। এসব নমুনা নিউ জার্সির সব ২১টি কাউন্টি থেকে এসেছে। মার্সার, হাডসন, সমারসেট, বার্গেন ও মিডলসেক্স কাউন্টিতে ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার হার বিশেষভাবে বেশি।
মানুষের আক্রান্তের হিসাবেও কয়েকটি কাউন্টি এগিয়ে রয়েছে। মনমাউথ কাউন্টিতে সবচেয়ে বেশি ছয়টি মানব সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এরপর মার্সার কাউন্টিতে চারটি এবং ক্যামডেন কাউন্টিতে তিনটি ঘটনা পাওয়া গেছে। মোট ১৩টি কাউন্টিতে মানুষের ওয়েস্ট নাইল সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার বিষয়টিও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের উদ্বিগ্ন করেছে। রাজ্যের তথ্যে দেখা যায়, আগস্টের শেষ সপ্তাহ ও সেপ্টেম্বর মাসে ১৪ জন ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। অর্থাৎ গ্রীষ্ম শেষ হওয়ার পরও সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে।
ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস সাধারণত আক্রান্ত পাখিকে কামড়ানোর পর ভাইরাস বহনকারী মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। পাখি থেকে সরাসরি মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়ায় না। তাই মশার সংখ্যা ও সংক্রমিত মশার উপস্থিতি কমানোই রোগ প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষের কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তবে কিছু মানুষের জ্বর, কাঁপুনি, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, জয়েন্টে ব্যথা কিংবা অন্যান্য সাধারণ অসুস্থতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ অনেক সময় অন্য ভাইরাসজনিত রোগের সঙ্গেও মিল থাকতে পারে।
অল্পসংখ্যক আক্রান্তের ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। তখন মস্তিষ্ক বা স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয়ে মেনিনজাইটিস বা এনসেফালাইটিসের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি, আচরণে পরিবর্তন, খিঁচুনি, শরীরের দুর্বলতা কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
বয়স্ক মানুষের জন্য ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। নিউ জার্সির এবারের আক্রান্তদের ৬৯ শতাংশের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা প্রবীণদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলেছেন। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রেও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
নিউ জার্সি স্বাস্থ্য বিভাগ বলেছে, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য বর্তমানে মানুষের ব্যবহারের কোনো নির্দিষ্ট টিকা নেই এবং রোগটির জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসাও নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা সহায়তার ওপর নির্ভর করে। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের বাইরে যাওয়ার সময় মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা, বাইরে থাকলে হাত-পা ঢেকে রাখা এবং ভোর ও সন্ধ্যার সময় অপ্রয়োজনে বাইরে না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ এই সময় মশার কার্যক্রম বেশি থাকতে পারে।
বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। ফুলের টব, পাখির পানির পাত্র, পোষা প্রাণীর পানির বাটি, পুরোনো টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, সুইমিং পুলের ঢাকনা, নষ্ট নালা এবং অন্যান্য জায়গায় জমে থাকা পানি মশার প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এসব জায়গায় পানি জমতে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলেছে, বাইরের পানির পাত্রগুলো নিয়মিত খালি করা বা পরিষ্কার করা উচিত। বিশেষ করে সপ্তাহে অন্তত একবার এসব জায়গা পরীক্ষা করলে মশার বংশবিস্তার কমানো সম্ভব। বাসা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জানালা এবং দরজার জাল ঠিকঠাক আছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
শিশুদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। বাইরে যাওয়ার সময় শিশুর স্ট্রলার, খাট বা বহন করার আসনে মশার জাল ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ির উঠান ও আশপাশে জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলার ওপর জোর দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নিউ জার্সির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শীতল আবহাওয়া শুরু হলেও মশার কার্যক্রম একেবারে বন্ধ হয়নি। ফলে শরৎকালে পার্ক, খোলা মাঠ, কৃষিখামার কিংবা বাইরে বিনোদনের সময়ও সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে প্রবীণদের বাইরে থাকার সময় মশার কামড় এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সিতে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় পরিবারগুলোর জন্যও এই সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিউ জার্সির বার্গেন, হাডসন ও মিডলসেক্সের মতো জনবহুল এলাকায় মশার নমুনায় ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। ফলে শহরাঞ্চলেও বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন, মশা নিয়ন্ত্রণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। বাড়ির মালিক, ভাড়াটিয়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় বাসিন্দা সবাই নিজ নিজ জায়গায় পানি জমতে না দিলে মশার প্রজননস্থল কমানো সম্ভব। এ ধরনের ছোট ছোট পদক্ষেপ পুরো কমিউনিটির ঝুঁকি কমাতে পারে।
নিউ জার্সিতে ২০২৬ সালের প্রথম ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে মৃত্যু এবং ২৬টি মানব সংক্রমণ নতুন করে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। বিশেষ করে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ব্যক্তিদের বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তবে আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে মশার কামড় এড়ানো, জমে থাকা পানি সরানো এবং গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।