চট্টগ্রাম বন্দরে ২৫ হাজার কেজি পপি সিড আটক — পেছনে বিশ্ববাজারের বিলিয়ন ডলারের ‘সোনালী ফসল’ ব্যবসা
যদি কঠোর নিয়ন্ত্রণে বৈধভাবে শিল্প-উদ্দেশ্যে পপি চাষ অনুমোদন করা হয়, তাহলে বাংলাদেশে কৃষকরা বছরে হাজার কোটি টাকার রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করতে পারবে।
চট্টগ্রাম বন্দরে ২৫ হাজার কেজি পপি সিড আটক — পেছনে বিশ্ববাজারের বিলিয়ন ডলারের ‘সোনালী ফসল’ ব্যবসা
চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তান থেকে আসা দুটি কন্টেইনারে প্রায় ২৫ হাজার কেজি নিষিদ্ধ পপি সিড (খাসখাস বীজ) আটক করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কন্টেইনার দুটির বৈধ ঘোষণায় পাখির খাদ্য দেখানো হলেও, গোপনে আমদানি করা হয়েছিল এই উচ্চমূল্যের পপি সিড, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
কাস্টমসের তদন্তে জানা গেছে, চট্টগ্রামের মেসার্স আদিব ট্রেডিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান গত ৯ অক্টোবর পাকিস্তান থেকে মোট ৩২,০১০ কেজি পাখির খাদ্য আমদানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমসের এআইআর (AIR) শাখা খালাস প্রক্রিয়া স্থগিত করে এবং পরে কন্টেইনার খুলে দেখা যায়, সামনের অংশে প্রায় ৭,২০০ কেজি পাখির খাবার রেখে এর পেছনে গোপনে ২৫,০০০ কেজি পপি সিড ঢেকে রাখা হয়েছে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পপি সিড বা খাসখাস বীজ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিষিদ্ধ, কারণ এই বীজের উৎস হচ্ছে অপিয়াম পপি (Papaver somniferum)— যা থেকে উৎপন্ন হয় মরফিন, কোডিন, হেরোইনসহ নানা মাদকদ্রব্য।
বিশ্ববাজারে পপি সিডের বহুমুখী ব্যবহার ও অর্থনৈতিক মূল্য
পপি সিড মূলত দুটি ভাগে ব্যবহৃত হয়—
1. খাদ্যশিল্পে: ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা ও তুরস্কে এটি রুটি, কেক, সস এবং সালাদে ব্যবহার হয়।
2. ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে: পপি ফুলের ফল থেকে সংগৃহীত দুধের মতো ল্যাটেক্স থেকে তৈরি হয় মরফিন ও কোডিন, যা ব্যথানাশক ওষুধ তৈরিতে অপরিহার্য কাঁচামাল।
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী,
বিশ্বব্যাপী আইনসিদ্ধ পপি চাষ হয় মূলত অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, ভারত ও ফ্রান্সে।
২০২4 সালের বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈধ পপি ও পপি সিড বাজারের আকার প্রায় ৭.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এক কেজি উচ্চমানের পপি সিডের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ৮ থেকে ১২ ডলার পর্যন্ত ওঠানামা করে।
বাংলাদেশে পপি চাষ নিষিদ্ধ কেন?
বাংলাদেশে পপি চাষ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কারণ—পপি ফুলের ফল থেকে সহজেই অপিয়াম বা আফিম উৎপাদন করা যায়, যা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মারাত্মক অপরাধ।
১৯৮০ সালের পর থেকে সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে পপি চাষের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কঠোর নিয়ন্ত্রণে বৈধভাবে শিল্প-উদ্দেশ্যে পপি চাষ অনুমোদন করা হয়, তাহলে বাংলাদেশে কৃষকরা বছরে হাজার কোটি টাকার রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করতে পারবে।
উদাহরণস্বরূপ,
প্রতি একর জমিতে গড়ে ১২–১৫ কেজি শুকনো পপি সিড উৎপাদন হয়।
আন্তর্জাতিক দরে এক একর জমি থেকে কৃষক আয় করতে পারে প্রায় ১,৫০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত।
ওষুধশিল্পে ব্যবহারযোগ্য অপিয়াম উৎপাদন করলে এই আয় আরও চার থেকে পাঁচগুণ বাড়তে পারে।
তবে বাংলাদেশে এমন অনুমতি নেই এবং এ ধরনের চাষ অবৈধ হিসেবে দণ্ডনীয় অপরাধ।
চট্টগ্রাম কাস্টমস জানিয়েছে, পপি সিডকে বাংলাদেশে মাদক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। তাই **এটি কোনোভাবেই আমদানি বা বাণিজ্য করা বৈধ নয়