জাতীয় নির্বাচন ঘিরে ত্রিমুখী সংকট: গণভোট ইস্যুতে উত্তেজনা বাড়ছে দেশে

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে। গণভোট ইস্যু যেমন নির্বাচনী সময়সূচিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, তেমনি নিষিদ্ধ দল ও আন্তর্জাতিক চাপ দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে আরও নাজুক করে তুলছে।

PostImage

জাতীয় নির্বাচন ঘিরে ত্রিমুখী সংকট: গণভোট ইস্যুতে উত্তেজনা বাড়ছে দেশে


বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও ত্রিমুখী সংকটে প্রবেশ করছে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এর কেন্দ্রে রয়েছে “জুলাই সনদ” — যেটিকে আইনি শক্তি দিতে গণভোট আয়োজনের দাবি তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।


বুধবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানান, “নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিন পার হলেও গণভোটের প্রস্তুতি শুরু হয়নি। তবে জাতীয় নির্বাচনের আগে যেকোনো সময়েই এই গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়া আবশ্যক।”


তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনের দিন গণভোট হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, ফলে ভোটারদের মনোযোগ বিভক্ত হবে। তাই আগে গণভোট আয়োজন করাই যুক্তিসঙ্গত।”

জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট — গণভোটকে অবাধ, সুষ্ঠু ও আইনি ভিত্তিক করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প গ্রহণযোগ্য নয়। দলটি জানায়, এই দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ না গণভোট বাস্তবায়িত হয়।

🔹 বিএনপির অবস্থান: “অজ্ঞাত এজেন্ডায় ভোট নয়”

অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপির যুক্তি, “গণভোটে যে এজেন্ডাগুলো আনা হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে সাধারণ ভোটাররা অবগত নন। তারা না বুঝে কীভাবে ভোট দেবেন?”

বিএনপি মনে করে, জাতীয় নির্বাচনের আগে আলাদা একটি গণভোট আয়োজন করা হলে তা নির্বাচনকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলবে। তাই তাদের অবস্থান, “যদি গণভোট হয়ও, সেটি জাতীয় নির্বাচনের দিনেই হতে হবে।”

দলটি এই দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়েছে এবং পৃথক গণভোট আয়োজনের সম্ভাবনাকে “রাজনৈতিক বিভাজনের ফাঁদ” বলে মন্তব্য করেছে।


🔹 আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ অবস্থা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

অন্যদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বর্তমানে রাজনৈতিক অচলাবস্থায় রয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পতিত শেখ হাসিনা সরকারের দলটিকে গণহত্যা ও স্বৈরাচারী আচরণের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিবন্ধন স্থগিত করেছে।


একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকেও নিষিদ্ধ সংগঠনের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ফলে দলটি আসন্ন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়ায় দলটির একটি অংশ ভারতে বসে নির্বাচনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। তারা নভেম্বরের মাঝামাঝি (১০–১৩ তারিখ) মধ্যে দেশজুড়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, যা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।


🔹 ত্রিমুখী অচলাবস্থা ও সম্ভাব্য বিলম্ব

এই তিন দিকের বিরোধ ও দাবি—

১️⃣ জামায়াতের আগাম গণভোটের দাবি,

২️⃣ বিএনপির নির্বাচনের দিন গণভোটের শর্ত,

৩️⃣ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও ষড়যন্ত্রমূলক অবস্থান—

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন এখন বিলম্ব বা স্থগিত হওয়ার ঝুঁকিতে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি অন্তর্বর্তীকালীন ইউনুস সরকার এই সংকটের ঐক্যবদ্ধ সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে “ত্রিমুখী আন্দোলন”-এর মাধ্যমে বর্তমান সরকারও টালমাটাল অবস্থায় পড়তে পারে।