আফ্রিকাকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী আসন দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানালেন খলিলুর রহমান
জাতিসংঘে আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের দাবি তুলে খলিলুর রহমান বললেন, ন্যায্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার স্বার্থে নিরাপত্তা পরিষদে পরিবর্তন এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
আফ্রিকাকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী আসন দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানালেন খলিলুর রহমান
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে আফ্রিকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বঞ্চনার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আফ্রিকাকে শুধু আলোচনার বিষয় হিসেবে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী বক্তব্যে খলিলুর রহমান বলেন, “আফ্রিকা টেবিলে থাকা উচিত, মেনুতে নয়।” তিনি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার ন্যায্য জায়গা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আফ্রিকার দীর্ঘস্থায়ী প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি দূর করা শুধু রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নয়; এটি ন্যায্যতা, বিচার এবং জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
খলিলুর রহমানের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো সংস্কারের দাবি আবারও আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় যে বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামো ছিল, বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতা তার তুলনায় অনেক বদলে গেছে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ এখনো পাঁচ দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স।
জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে আফ্রিকার রয়েছে ৫৪টি দেশ। এত বড় একটি মহাদেশের কোনো দেশই নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য নয়। আফ্রিকার দেশগুলো অবশ্য নির্বাচিত অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদে দায়িত্ব পালন করে থাকে। তবে এসব সদস্যের মেয়াদ সাধারণত দুই বছর এবং তাদের ভেটো ক্ষমতা নেই। ফলে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আফ্রিকার প্রভাব সীমিত থেকে যায়।
আফ্রিকান ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে এই কাঠামোগত বৈষম্যের অবসান দাবি করে আসছে। Ezulwini Consensus এবং Sirte Declaration-এর মাধ্যমে আফ্রিকা তার যৌথ অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ওই অবস্থান অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার জন্য অন্তত দুটি স্থায়ী আসন এবং পাঁচটি অস্থায়ী আসন থাকা উচিত। স্থায়ী সদস্যপদের ক্ষেত্রে বর্তমান স্থায়ী সদস্যদের মতো অধিকার ও সুযোগ, ভেটো ক্ষমতা বহাল থাকলে সেই ভেটো ক্ষমতাও দেওয়ার দাবি রয়েছে।
আফ্রিকার যুক্তি হলো, বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো মহাদেশটির ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে না। ঔপনিবেশিক শাসনের সময় আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের সদস্য ছিল না। ফলে বর্তমান কাঠামোর বড় একটি অংশ এমন সময়ে গড়ে উঠেছিল, যখন আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব ছিল অত্যন্ত সীমিত। আফ্রিকার নেতারা মনে করেন, এই ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রভাব এখনো আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় রয়ে গেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, একবিংশ শতাব্দীর নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকা একটি অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য পরিস্থিতি। একই সঙ্গে আফ্রিকান ইউনিয়নও এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আরও প্রতিনিধিত্বশীল বৈশ্বিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁসহ কয়েকটি দেশ আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তবে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এখনো অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়। কারণ স্থায়ী সদস্যপদ বাড়ানোর পাশাপাশি ভেটো ক্ষমতা, নতুন সদস্যদের নির্বাচন, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং পরিষদের মোট সদস্যসংখ্যা সবকিছু নিয়েই সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
খলিলুর রহমানের বক্তব্য তাই শুধু আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে একটি রাজনৈতিক আহ্বান নয়; এটি জাতিসংঘের সামগ্রিক সংস্কার ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্যই হলো আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন মোকাবিলা এবং এমন একটি জাতিসংঘ গড়ে তোলা, যা সবার জন্য কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে আফ্রিকার গুরুত্বও দ্রুত বাড়ছে। মহাদেশটি জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, অভিবাসন, সন্ত্রাসবাদ, শান্তিরক্ষা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাত ও মানবিক সংকটও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনায় নিয়মিত উঠে আসে। ফলে যে মহাদেশ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার নানা সংকটের সরাসরি প্রভাব বহন করছে, সেই মহাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ কাঠামোয় স্থায়ী উপস্থিতি থাকা উচিত এটাই আফ্রিকার মূল যুক্তি।
তবে খলিলুর রহমানের বক্তব্যের পরও তাৎক্ষণিকভাবে আফ্রিকার জন্য স্থায়ী আসন নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এটি এখনো জাতিসংঘের আন্তঃসরকারি আলোচনার অংশ। নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিস্তৃত রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন।
তবু এবারের অধিবেশনে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। বাংলাদেশের কূটনীতিক ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের সরাসরি আহ্বান সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো বিশ্বব্যবস্থার বৈধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে হলে বৈশ্বিক দক্ষিণের, বিশেষ করে আফ্রিকার, কণ্ঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে।
সুতরাং “আফ্রিকা টেবিলে, মেনুতে নয়” এই বক্তব্যটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বহু বছরের কাঠামোগত সংস্কার বিতর্কের প্রতীকী প্রকাশ। এখন দেখার বিষয়, সদস্যরাষ্ট্রগুলো এই আহ্বানকে কতটা বাস্তব সংস্কারে রূপ দিতে পারে।